রবিবার , ২৪ জুন ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » মেতেছে বাঙালি প্রাণের উৎসবে

মেতেছে বাঙালি প্রাণের উৎসবে

বটপহেলা বৈশাখে প্রভাতের আলো ফোটার সাথে সাথে উত্সবে মেতে উঠলো পুরো জাতি। জীর্ণ পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে শুভ সম্ভাবনার নতুন দিন আনবার প্রত্যয়ে প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতে উঠলো সংশয়বিনাশী চিত্ত। পহেলা বৈশাখে নতুন বছরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রমনা বটমূলে শুরু হলো ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠান। শুরু হলো বাঙালির বর্ষবরণ। ছায়ানট আর বাঙালির বর্ষবরণ এখন সমার্থক। প্রতিবছরের  মত এবারও রমনার বটমূলে শিল্পীদের গানের মধ্য দিয়েই যেন উদিত হলো নতুন বছরের নতুন সূর্য। শুভ দিনের প্রত্যাশায় মানুষের মনে গুনগুনিয়ে উঠলো ‘নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে’। স্বাগতম ১৪২২, সুস্বাগত।
প্রকৃতির নিয়মে আসে বৈশাখ। কিন্তু পহেলা বৈশাখ জাতির জীবনে আসে দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রত্যয়ে এবার পালিত হচ্ছে নববর্ষ। পৃথিবীজুড়ে প্রতিটি বাঙালি আজ গানে গানে আহ্বান জানাচ্ছে সম্ভাবনাময় নতুন দিনকে। গানের পংক্তি উচ্চারণে তারা বর্জন করতে চাইছে জীবনে জড়িয়ে থাকা সকল পঙ্কিলতাকে। বরণ করে নিতে চাইছে নতুন বছরকে।
ঊষালগ্নে সেতারে সুর-মুর্ছনার মধ্য দিয়ে শুরু হলো এবারকার আনুষ্ঠানিকতা। প্রখ্যাত প–িত রবি শংকরের সৃষ্ট  রাগ ‘পরমেশ্বরী’ আলাপ জোড় পরিবেশন করেছেন এবাদুল হক সৈকত। ১৪ মিনিটের এই পরিবেশনার পর সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হলো রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্যায়ের গান ‘ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর প্রভাত-অম্বর-মাঝে/দিকে দিগন্তরে ভুবন মন্দিরে শান্তি সঙ্গীত বাজে’। মূলত এই গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ছায়ানটের ৪৭তম গানে গানে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
সেতারের সুর শেষে যখন চোখ মেলেন, তখন তাদের পাশের ভিড় যেন বেড়েছে আরো কয়েকগুণ। বরাবরের মতো করেই মূল মঞ্চে বসেছিলেন ছায়ানট বিদ্যায়তনের নানা বর্ষের শিল্পীরা। বড়দের মধ্যে ছিলো চতুর্থ ও পঞ্চম সমাপনী বর্ষের বাছাইকৃত শিল্পীরা। আর খুদে গাইয়েরা ছিলো ছায়ানটের প্রারম্ভিক শিশু প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। সংখ্যা এরা ৯৫ জন। বড় মেয়েদের পরনে ঘিয়ে রঙের শাড়ি ও হলুদ ব্লাউজ। আর খোঁপায় এদের সকলেই গেঁথেছিলেন বেলি ফুলের মালা। যাতে সুরের সঙ্গে সৌরভও ছিল পুরো আয়োজন জুড়ে। আর ছেলেদের শিল্পীরা গায়ে চড়িয়েছিলেন সাদা রঙের পাঞ্জাবি।
প্রতিবছরের মতো এবারো ছায়ানটে একটি বিশেষ বিষয়ের উপর নিজেদের আয়োজনটি সাজায়। যার মূল প্রতিপাত্য- ‘শান্তি, মানবতা ও মানুষের অধিকার’। এ বিষয়ের উপর ভিত্তি করে সঙ্গীত ও কবিতা পাঠের মধ্যে সম্প্রীতি ও শান্তির বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেন সকলে।
সেতারের সুর শেষ হতে না হতেই সবগুলো কণ্ঠ এক হয়ে গেয়ে শোনালো ‘ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর’। প্রায় শতকণ্ঠের সুরলহরী থামতেই লাইসা আহমেদ লিসা পরিবেশন করেলেন ‘নিশিদিন মোর প্রাণে’ গানটি। এবার খুদে কণ্ঠের পরিবেশনা- ‘ওঠো ওঠো রে’। এরপর দুইটি একক গান; ফারহানা আক্তার শ্যার্লি গাইলেন ‘ভোরের হাওয়ায় এসে’ আর ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আনাম শাকিলের কণ্ঠে শোনা গেলো আলোকিত সকালের জাগ্রত হওয়ার আহ্বান ‘জাগো অরুণ ভৈরব’। ছায়ানটের জেষ্ঠ্য শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে এরপর গীত হয় ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল হে চির নির্মল’ গানটি। শিল্পী তানিয়া মান্নান ঝটপট গেয়ে ফেললেন ‘আমি তোমারি মাটির কন্যা’ গানটি।
এরপর গান থেকে ক্ষনিকের বিরতি। পাঠ নিয়ে মঞ্চে আসেন আব্দুস সবুর খান চৌধুরী। তিনি পাঠ করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিরযাত্রী’ কবিতাটি। তার ভরাট কণ্ঠে সকালে নির্মল বাতাসে ভেসে আসে- ‘অস্পষ্ট অতীত থেকে বেরিয়ে পড়েছে ওরা দলে দলে,/ ওরা সন্ধানী , ওরা সাধক,/ বেরিয়েছে পুরাপৌরাণিক কালের/ সিংহদ্বার দিয়ে…।’
পাঠের মুগ্ধতার রেশ থাকতে থাকতেই ছায়ানটের বড় ও ছোট শিক্ষার্থীরা এক হয়ে পরিবেশন করে ‘মোরা সত্যের পরে মন’ গানটি। এরপর ছোটদের কণ্ঠে ‘জয় হোক জয় হোক’ ও বড়দের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘ওরে বিষয়ম দইরার ঢেউ’ গানটি। এরপর বরেণ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের কণ্ঠে পরিবেশিত হয় ‘ওরে ভাই মিথ্যা ভেবো না’ গানটি।
এরপর একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন নাসিমা শাহিন ফ্যান্সি। তিনি গেয়ে শোনান ‘নিচুর কাছে নিচু হতে’ গানটি। সিফায়েত উল্লাহ্্ মুকুল পরিবেশন করেন ‘যদি তোর ভাবনা থাকে’। বিদ্যায়তনের ছোট শিল্পীদের কণ্ঠে গীত হয় ‘আলোর দেশ থেকে’ ও বড়দের কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হয় ‘সংঘ শরণ তীর্থযাত্রা পথে’ গান দুইটি। মাহমুদুল হাসান পরিবেশন করেন ‘জাগো সত্যের শুভ্র আলোয়’, মোহিত খান পরিবেশন করেন ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার বাংলাদেশের মাটি’। ছায়ানটের জেষ্ঠ্য শিল্পীরা এরপর গেয়ে শোনান ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানটি। বিজনচন্দ্র মিস¿ী পরিবেশন করেন ‘জাগো অনশন বন্দি ওঠো রে’ ও চন্দনা মজুমদার গেয়ে শোনান ‘মানুষ গুরু নিষ্ঠা যায়’।
এরপর আয়োজনের শেষ পাঠ। লিয়াকত খান পাঠ করে শোনান ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটি। যা মুক্তিযুদ্ধের সময় লিখেছিলেন আমাদের সুহৃদ পাকিস্তানের কবি কাইফি আজমী। যার বঙ্গানুবাদ করেছেন মৌরি আইয়ূব। একজন পাকিস্তানি নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের প্রতি তার মমত্ববোধ ফুটে ওঠে এই কবিতায়- ‘তুমি জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে পার/ আমি সেরকম কোনো দেশ নই/ তুমি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পার/ আমি সে রকম কোনো দেয়াল নই…কী অবাক কী আশ্চর্য দ্যাখো/ চৌদ্দ কোটি হস্ত আজ শূন্যে উত্থিত/ কোন হাতে পরাবে শিকল/ আমার স্কন্ধে সাত কোটি উদ্ধত মস্তক/ কটি তার ছিন্ন করবে তুমি !!
এরপর শেষ একক কণ্ঠে গান পরিবেশন করেন সুকান্ত চক্রবর্তী। তার কণ্ঠে গীত হয় ‘ব্যর্থ প্রাণের আর্বজনা’ গানটি। এরপর ১৪ বছর আবারো ছায়ানটের পহেলা বৈশাখের প্রভাতী আয়োজন থেকে ধ্বনিত হয় কবিগুরুর লেখা অমর গান ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি। ছায়ানটের ছোট-বড়, সব শিল্পীদের একসঙ্গে গেয়ে শোনান গানটি। যাতে সুরে মেলাতে ভোলেন নি রমনার বটমূলে উপস্থিত লাখো মানুষ। এরপর ছায়ানট সভাপতি রবীন্দ্র গবেষক ড. সন্্জীদা খাতুন অংশ নেন বৈশাখ কথনে। যার কথা শেষে ছায়ানটের খুদে শিল্পীরা গেয়ে শোনায় ‘ধিন ধিন ধিন তাক ধিনা ধিন’ গানটি। ছায়ানটের রীতি অনুযায়ী জাতীয় সঙ্গীতের পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে আর্কষনীয় আয়োজনটি।

পুরো আয়োজনে সবার সঙ্গে বেহালায় ছিলেন আলমাছ আলী, এসরাজে অসিত বিশ্বাস, ঢোলে দশরথ দাশ, দোতরায় রতন কুমার রায়, তবলায় এনামুল হক ওমর, সুবীর ঘোষ ও স্বরূপ হোসেন এবং মন্দিরায় ছিলেন প্রদীপ কুমার রায়।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print