শনিবার , ১৮ আগস্ট ২০১৮
মূলপাতা » ফুটবল » ইয়েমেন ইস্যুতে মুখোমুখি সুন্নী আরব ও শিয়া ইরান

ইয়েমেন ইস্যুতে মুখোমুখি সুন্নী আরব ও শিয়া ইরান

yemenইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বুহু মানসুর আল-হাদির সমর্থনে শিয়া উপজাতি হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শুক্রবারও সৌদি নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় সুন্নী রাষ্ট্রগুলোর বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনে সৌদি আরবের এই হস্তক্ষেপ ‘বিপজ্জনক’ হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। অবিলম্বে এ হামলা বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছে ইরান।
কিন্তু শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হুথিদের প্রতি অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। তবে দেশটি বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে।
হুথি বিদ্রোহীদের নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি এই অভিযানকে ‘অবিচার’ হিসেবে অভিহিত করে ‘অপরাধমূলক আগ্রাসন’ মোকাবেলার জন্য তার সমর্থকদের আহ্বান জানান।
এদিকে প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বুহু মানসুর আল-হাদি বৃহস্পতিবার থেকেই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে রয়েছেন। সেখান থেকে আরব লীগ সম্মেলনে অংশ নিতে মিশরে যাবেন তিনি।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন হামলার সমর্থন জানিয়েছেন আরব লীগের প্রধান নাবিল আল-আরাবি। যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যও এ হামলায় সমর্থন জানিয়েছে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এই হামলায় যোগ দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, মরক্কো, জর্ডান, কাতার ও সুদান।
এছাড়া মিশরও এই হামলায় যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এমনকি পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এ অভিযানে অংশ নিতে সৌদি সরকারের অনুরোধ বিবেচনা করছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বিষয়টি নিয়ে এক জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন।
প্রসঙ্গত, চার বছর আগে আরব বিশ্বজুড়ে তোলপাড় তুলেছিল আরব বসন্ত নামে পরিচিত হয়ে ওঠা গণ-আন্দোলন। ওই গণাজাগরেণের সময়ই ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ওই ঘটনার পর যেসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত এই অঞ্চলকে একে একে গ্রাস করেছে, তা মূলত কট্টর সুন্নি ও শিয়াদের মধ্যে লড়াই।
মুসলিমদের দুই বড় গোষ্ঠীর এই সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বই এখন এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আর এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে আঞ্চলিক দুই প্রভাবশালী দেশ- সুন্নিপ্রধান সৌদি আরব ও শিয়াপ্রধান ইরান। এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে যা-ই হোক, ইয়েমেন দৃশ্যত পরিণত হয়েছে এই দুই আঞ্চলিক শক্তির ছায়া রণক্ষেত্রে।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বলি হওয়া এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও বাহরাইন।
ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে, এক দশকের বেশি আগে এমন খবর চাউর হওয়ার আগে থেকেই তেহরান-রিয়াদ দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। পারমাণবিক বোমা বানাতে পারলে ইরানের এই অঞ্চলের অদ্বিতীয় পরাশক্তি হওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে। এতে করে দেশে দেশে ১৯৭৯ সালে সংগঠিত ‘ইরানের ইসলামি বিপ্লবের’ মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়া আরও জোরদার করা যাবে।
আর স্বভাবতই ইরানের পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার প্রচণ্ড বিরোধী সৌদি আরব। এটি উপসাগরীয় এলাকার সবচেয়ে প্রভাবশালী সুন্নি দেশ। ফলে এই অঞ্চলের একটি দেশে সংঘাত মানেই সেখানে রিয়াদ ও তেহরানের প্রভাব খাটানোর আরেকটি প্রতিযোগিতা; আরেকটি ছায়াযুদ্ধ।
এই তিক্ত বিরোধের নজির বর্তমানে ইয়েমেনে যেমনটি অনুভব করা যাচ্ছে, সে রকম আর অন্য কোথাও হয়নি।
আরব বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের প্রভাববলয়ের অধীনে। বেশির ভাগ আরবই দেশটিকে সৌদি আরবের ‘পেছনের উঠান’ বিবেচনা করে।
নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ ও উত্তর ইয়েমেন একীভূত হওয়া থেকে শুরু করে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর দেশের একচ্ছত্র নেতা হওয়া পর্যন্ত সবখানেই রিয়াদ ইয়েমেনের রাজনীতিতে কর্তৃত্ব দেখিয়েছে। সালেহর শাসনামলেও সৌদি প্রভাব অক্ষুণ্ন ছিল।
তবে অন্তত দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা গত এক দশকে পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। তা হচ্ছে আল-কায়েদা ইন দি অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা (একিউএপি) ও ইরানের মদদপুষ্ট শিয়া হুথিদের উত্থান।
একিউএপি প্রয়াত সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী ওসামা বিন লাদেনের প্রতিষ্ঠিত জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার শাখা। আগের তুলনায় শক্তি হারিয়ে ফেলা আন্তর্জাতিক সংগঠন আল-কায়েদার এই শাখাটিই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী। একিউএপি ইয়েমেনে জাতিগত ও সামাজিক উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় দুটি শিয়া মসজিদের বাইরে সৌদি আরবের হামলার আগে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করেছে আরেক সুন্নী জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। তুলনামূলকভাবে নতুন এই জঙ্গিগোষ্ঠীটির সঙ্গে একিউএপির দ্বন্দ্ব থাকলেও উভয়েই সুন্নি। অনেকেরই সন্দেহ, প্রতিবেশী ইয়েমেনে তৎপরতা চালাতে আইএসকে সহায়তা দিচ্ছে সৌদি আরব। যদিও দেশটি আইএসবিরোধী মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে।
তবে বিশেষ করে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বুহু মানসুর আল হাদি সানা থেকে দক্ষিণের এডেন শহরে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে তাঁর বাসভবনে হুতিদের বিমান হামলার সঙ্গে ওই আত্মঘাতী হামলার সময়টা মিলে যাওয়ায় সন্দেহটা হালে পানি পাচ্ছে।
অতীতে বাহরাইনের সুন্নি নেতৃত্বাধীন রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইরান-সমর্থিত গণবিক্ষোভ দমনে সেনা পাঠাতে দেরি করেনি সৌদি আরব। ইয়েমেনেও সৌদিরা সেই একই পথে হাঁটলো। ফলে তেহরান-রিয়াদ দ্বন্দ্ব যে এখন আরও প্রকাশ্য ও প্রকট রুপ ধারণ করলো তা বলাই বাহুল্য।

আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print