সোমবার , ১৬ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » বেসরকারি » নিয়োগ বাণিজ্যে কোটিপতি কামাল!

নিয়োগ বাণিজ্যে কোটিপতি কামাল!

ACCচাকরি জীবন শুরু হয় অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে। এরপর ঘুষ ও তদবিরের জোরে বারবার পদোন্নতি নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উপ-মহাব্যবস্থাপক হন খান মোহাম্মদ কামাল। নিয়োগ বাণিজ্য, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ডিপো থেকে মোটা অংকের ঘুষ ও চাঁদা আদায় করে জিরো থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তিনি।

বিআরটিসির তদন্ত প্রতিবেদন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বিআরটিসির সাবেক এ কর্মকর্তার এমন দুর্নীতির চিত্র। কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মামলার সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদনও তৈরি করা হচ্ছে। আর এসব অনিয়মের কারণে তাকেসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন চেয়ে খুব শিগগিরই অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দিতে যাচ্ছেন অনুসন্ধানী কর্মকর্তা।

দুদক সূত্র জানায়, বিআরটিসি থেকে কামালের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এলে দুদক তা আমলে নিয়ে গত বছরের আগস্টে অনুসন্ধান শুরু করে। দুদকের উপ-পরিচালক হামিদুল হাসানকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে তার অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্তির সত্যতা ও ঘুষ-চাঁদাবাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার তথ্য-প্রমাণ।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ১৯৮৭ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই বিআরটিসির হোস্টেল সুপার পদে নিয়োগ পান খান মোহাম্মদ কামাল। এরপরে বদলি আইন ও বিধির সুপস্পষ্ট লঙ্ঘন করে ‘সহকারী ট্রাফিক অফিসার’ পদটি খালি না হওয়া সত্ত্বেও অল্প সময়ের মধ্যে একই সালের ২৭ অক্টোবরে এই পদে তাকে বদলি করা হয়। তিনি ১৯৮৭ সালের তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় এই অবৈধভাবে পদোন্নতি লাভ করেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

এরপর নানা কূটকৌশলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে একই পন্থা অবলম্বন করে অল্প সময়ের মধ্যে ১৯৯১ সালের ১৭ নভেম্বর তাকে ‘সহকারী ট্রাফিক অফিসার’ থেকে সিলেকশন গ্রেডে উন্নীত করা হয়। এরপর ১৯৯৭ সালে ২০ এপ্রিল ডেপুটি ম্যানেজার (অপারেশন) পদে উন্নিত করা হয়। নিয়ম বহির্ভূত নিয়োগ জারি করে ২০০৪ সালের ২৪ জুন ম্যানেজার (অপারেশন) পদে উন্নিত হয় খান মো. কামাল। শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূতভাবে ২০১২ সালের ২২ মার্চ উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পদে উন্নিত হন তিনি। এবং চাকরির শেষ সময় পর্যন্ত এই পদেই বহাল ছিলেন। আর এরই মধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ ও নানা অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হন খান মোহাম্মদ কামাল ।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভয়াবহ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন খান মোহাম্মদ কামাল। তিনি ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল হতে ২০১২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মতিঝিল বাস ডিপোতে ইউনিট প্রধান দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি এই দায়িত্বে থাকালীন অবস্থায় বিআরটিসির স্বার্থবিরোধী কাজ করে ৮৮ লাখ ৫৯ হাজার ৪৭৫ টাকার ক্ষতি সাধন করে। তিনি এসব টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে জানা যায়।

নারায়ণগঞ্জ বাস ডিপোর সাবেক ম্যানেজার মনিরুজ্জামান বাবুকে বদলির হুমকি দিয়ে ৫ লাখ টাকা ঘুষ আদায়; প্রতিমাসে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার শর্তে জমসেদ নামে এক ব্যক্তিকে মতিঝিল বাস ডিপোর ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার করা; খুলনা বাস ডিপো থেকে প্রতি মাসে এক লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে।

এছাড়া, ঢাকার কল্যাণপুর ট্রাক ডিপো, ডাবল ডেকারের বাস ডিপো, চট্টগ্রাম ট্রাক ও বাস ডিপো থেকে প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা করে চাঁদা; ঢাকার বাইরের বিভিন্ন পেট্রোলপাম্প থেকে প্রতি মাসে ৮ লাখ টাকার চাঁদা আদায়; বিআরটিসির ক্রয় খাত থেকে প্রতি মাসে ৫ লাখ টাকা আত্মসাতসহ বিআরটিসির গাড়ি আমদানির সময় কোরিয়ার এজেন্টদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত হয় দুদকের অনুসন্ধানে।

খান মোহাম্মদ কামাল নিজ জেলা বরিশালে অত্যাধুনিক ৫তলা বাড়ি; শহরের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকটি প্লটের মালিক হয়েছেন। আর স্ত্রীর নামে ঢাকায় কিনেছেন দুটি ফ্ল্যাট। এছাড়া তার দুটি ব্যাংক হিসাবে ৪০-৫০ কোটি টাকা জমা আছে। এসবের সঠিক কোনো আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি দুদকের অনুসন্ধানে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দুদক কর্মকর্তা জানান, বিআরটিসির সাবেক এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা বেরিয়ে আসে অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে। এরপর তা অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য দুদকে পাঠায় বিআরটিসি। দুদকের অনুসন্ধানেও সেসব দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। ইতিমধ্যে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করার কাজ প্রায় শেষ।

তাই খুব শিগগিরই তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। আর যাদের সহযোগিতায় এইসব অনিয়ম তিনি করেছেন তাদেরও আসামি করার ব্যাপারে সুপারিশ করা হতে পারে বলে জানান তিনি।

#


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print