শুক্রবার , ২২ জুন ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে!

বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে!

BAGH-1425799249রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমে গেছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চলতি মার্চ মাসের শেষ দিকে ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতিতে বাঘের ছবি সংগ্রহের জরিপকাজ শেষ হবে। এরপর জুন মাসে এই জরিপের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তখনই সুন্দরবনে বাংলাদেশ অংশে বাঘের প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে। এই আধুনিক পদ্ধতিতে বাঘ গণনা জরিপে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাঘের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। শুধু গণনার পদ্ধতিগত কারণে নয়, প্রতিনিয়ত বাঘ হত্যার কারণেও বাঘের সংখ্যা কমছে বলে তাদের ধারণা।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণের খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জাহিদুল কবির বলেন, ‘বাঘের পায়ের ছাপ হিসেবে ২০০৪ সালের গণনার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকায় ওই জরিপের ফলাফল পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়নি।

এরপর ভারত ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতিতে তাদের সুন্দরবন অংশে বাঘ গণনা শুরু করে। এই পদ্ধতিতে তাদের গণনা শেষ হয়েছে। পায়ের ছাপ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ অংশে যখন বাঘ ছিল ৪৪০টি তখন ভারত অংশে দেখা গেছে ২৭০টি। আর ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতিতে এখন ৭৬টি পাওয়া গেছে ভারতের সুন্দরবন অংশে। সে হিসাবে বাংলাদেশেও বাঘের সংখ্যা কমে আসা অস্বাভাবিক নয়।’

খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জাহিদুল কবির জানান, বাঘ গণনায় ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ ধরনের ক্যামেরা। যা বাঘের চলাচলে এলাকা শনাক্ত করে গোপনে গাছে লাগিয়ে রাখা হয়।

ক্যামেরার সামনে যা কিছুই নড়াচড়া করবে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারই ছবি ধারণ হবে। ভারতে যে বিশেষজ্ঞরা গণনা করেছেন, তারা বাংলাদেশেও গণনায় সহযোগিতা করছেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সুন্দরবন রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান সরদার সফিউল আলম বলেন, প্রতিনিয়ত বাঘ হত্যার কারণে বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তবে পায়ের ছাপ পদ্ধতির চেয়ে ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনেক বেশি। বাঘ এখন বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। এখনই বাঘ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নেওয়া না হলে সুন্দরবনের বাঘ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

শরণখোলার সাউথখালী ইউনিয়নের কয়েকজন বনজীবী বলেন, সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় আগে বাঘ দেখা গেলেও এখন তেমন একটা দেখা যায় না। বনদস্যুরাও এখন বাঘ হত্যা করছে।

বাঘ হত্যায় বনদস্যুদের সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়ার কথা বন কর্মকর্তা জাহিদুল কবিরও স্বীকার করেছেন।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আমীর হোসেন চৌধুরী জানান, ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবন এলাকায় চোরা শিকারিদের হত্যা করা ৯টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে।

বন থেকে পাচার হয়ে যাওয়া বাঘের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। চোরা শিকারিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া চামড়া অনুযায়ী বাঘের হিসাব রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বাঘ হত্যার ঘটনা যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছয়টি শিকারি দল বাঘ হত্যায় তৎপর রয়েছে। তারা সুযোগ পেলেই বাঘ হত্যা করে চামড়া বিভিন্ন দেশে পাচার করছে। পশ্চিম বন বিভাগে শিকারিরা বেশি তৎপর। সম্প্রতি তিন মাসের ব্যবধানে র‌্যাব তিনটি বাঘের চামড়া উদ্ধার করেছে। তবে এ পর্যন্ত শিকারিদের হাতে কতটি বাঘ মারা পড়েছে, তার হিসাব পশ্চিম বন বিভাগের কাছে নেই।

বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত চোরা শিকারি ও বনদস্যুদের হামলা, গ্রামবাসীর পিটুনি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সুন্দরবনে ৭০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিন পরিস্থিতিতে বাঘ লোকালয়ে এসে হত্যার শিকার হয়। পশ্চিম বন বিভাগে বাঘ লোকালয়ে আসার ঘটনা বেশি ঘটে। প্রথমত, সে যে এলাকায় থাকে সে এলাকায় খাবারের অভাব। দ্বিতীয়ত, দুই আড়াই বছর বয়সে বাঘ তার মাকে ছেড়ে আলাদা হয়ে যায়।

এ সময় সে তার টেরিটোরি প্রতিষ্ঠা করার জন্য এলাকা খুঁজতে খুঁজতে বনের বাইরে আসতে পারে। তৃতীয়ত, বৃদ্ধ হয়ে গেলে বা অসুস্থ হলে বাঘ তার টেরিটোরি হারিয়ে ফেলে। আরেকটি বাঘ তার স্থান দখল করে নেয়। তখন সে সহজে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্পবিষয়ক আঞ্চলিক সহযোগিতায় ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৩ সালে এ গণনা শুরু হয়। চলবে আগামী জুন মাস পর্যন্ত। এ প্রকল্পে ব্যয় প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাঘ গণনার প্রথম ধাপ শেষ হয় ২০১৪ সালের এপ্রিলে। এ সময় বাঘের ছবি ধারণের জন্য সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে ৮৯টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপে বাঘ গণনার জন্য ২০১৪ সালের ১১ নভেম্বর থেকে ৩০ জন মাঠকর্মী ৩৫টি স্পটে দুটি করে মোট ৭০টি ক্যামেরা বসানোর কাজ করেন।

বন বিভাগ সূত্রে আরো জানা যায়, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে সোয়া ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১ হাজার ৩৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নমুনা অংশ ধরে তিনটি ব্লকে ভাগ করে ক্যামেরা ট্র্যাপ পদ্ধতিতে বাঘের ছবি সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব ব্লকে ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে গণনা করা হয়। একই পদ্ধতিতে দ্বিতীয় ধাপে দক্ষিণ ব্লকে ৬৪০ বর্গকিলোমিটারে ছবি তোলা চলছে।

মার্চের শেষে বন থেকে ক্যামেরা তুলে আনা হবে। জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল জানানো হবে।

সুন্দরবনে বাঘের জীবনচক্র

চার বছর বয়স থেকে বাচ্চা দেওয়া শুরু করে বাঘিনী। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বছর বছর বাচ্চা দেয় না। দুই থেকে তিন বছরে একবার বাচ্চা দেয়। বাঘিনী তার জীবনচক্রে দুই থেকে তিনবার বাচ্চা দিতে পারে। গর্ভধারণের পর বাঘিনী ১০০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে দুই থেকে চারটি বাচ্চা দেয়। তবে গড় হিসাবে ধরা হয় ১০৩ দিন।

বাচ্চা একাধারে দুই মাস মায়ের দুধ পান করে। দুই মাসের পর অন্যান্য খাবার খেতে শুরু করে এবং অল্প দূরত্বে মায়ের সঙ্গে যাতায়াত করে। সাধারণত এক বছর পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে বেশি দূরে বা শিকারে যায় না।

এক বছর পর মায়ের সঙ্গে শিকারে যেতে শুরু করে এবং বিভিন্ন কলাকৌশল শেখে। দুই থেকে আড়াই বছরে মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়। নিজের টেরিটোরি প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। টেরিটোরি প্রতিষ্ঠা করে জুটি খুঁজতে শুরু করে। সাড়ে তিন বছর বয়সের মধ্যে জুটি খুঁজে নেয়।

সুন্দরবনে বাঘের গড় আয়ু ১৫ থেকে ১৮ বছর। তবে চিড়িয়াখানায় বাঘ আরো বেশি দিন বাঁচতে পারে। ১২ বছর বয়স হলে সেই বাঘকে বৃদ্ধ বলে ধরা হয়। এরপর ধীরে ধীরে তার সক্ষমতা কমতে থাকে। তবে ১০ বছর বয়সের পর বাঘিনীর বাচ্চা দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না।

সুন্দরবনের বাঘের প্রিয় খাবার হরিণ। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, আগে বাঘ ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে হরিণ খেত। এখন কোথাও কোথাও শূকর খাওয়ার পরিমাণ বেশি । যেখানে পর্যাপ্ত খাবার আছে, যেখানে কেউ তাকে বিরক্ত করবে না অর্থাৎ নিরাপদ এলাকা বাঘ বসবাসের জন্য বেছে নেয়।

#


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print