শুক্রবার , ২৭ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » ভুল একাদশই পাকিস্তানের হারের কারণ: মিয়াঁদাদ

ভুল একাদশই পাকিস্তানের হারের কারণ: মিয়াঁদাদ

জাভেদ মিয়াঁদাদবিশ্বকাপ সেই ১৯৯২ থেকে ২০১৫৷ সিডনি থেকে অ্যাডিলেড। প্রথম দুই পরাজয়ের সময় পাকিস্তানের জার্সিতে মাঠেই ছিলেন জাভেদ মিয়াঁদাদ। এরপর বিশ্বকাপে আরো ৪ বার ভারতের মুখোমুখি হয়ে পাকিস্তান জিততে পারেনি একবারও।

রোববারের টানা ষষ্ঠ ম্যাচ হারের জন্য পাকিস্তান টিম ম্যানেজম্যান্টকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান। ভুল একাদশ নির্বাচন, স্পেশালিস্টদের বাদ দেওয়া, অফফর্মে থাকাদের নেওয়া-মিয়াঁদাদের অভিযোগের শেষ নেই।

বড় ম্যাচে সব দল সবসময় সেরা একাদশই খেলায়, কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথে হাঁটে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সহজ এই ফর্মুলা পাকিস্তান মনে রাখে না কখনও। এ কারণেই ভারত-পাকিস্তানের বড় ম্যাচটি হয়ে গেল এমন একপেশে।

অ্যাডিলেইডের ব্যাটিং স্বর্গে ৭৬ রানের সহজ জয় পেয়েছে ভারত। তাতে বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের রেকর্ডটি তারা বাড়িয়ে নিল ৬-০তে। এই বৃত্ত ভাঙার জন্য আমাদের হয়তো আরো চার বছর অন্তত অপেক্ষা করতে হবে।

বিশ্বজোড়া পাকিস্তানী সমর্থকদের আজ যা সবচেয়ে চমকে দিয়েছে, সেটি একাদশ নির্বাচন। কোন রকেট সায়েন্সে ইউনিস খানকে বানানো হল ওপেনার? স্পেশালিস্ট উইকেটরক্ষক সরফরাজ আহমেদকে বাদ দেওয়া হল কোন যুক্তিতে, বিশেষত ও যখন আগ্রাসী ব্যাটিংটাও পারে ভালো? এটা যেন আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৫ এর মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টের আগে তালগোল পাকিয়ে ফেলা।

নাসির জামশেদের ব্যাপার একটু অন্যরকম। বুঝি যে, ইনজুরিতে পড়া মোহাম্মদ হাফিজের বদলে শেষ মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়া উড়ে যেতে হয়েছে ওকে। তা সেখানে কি ও গিয়েছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গা গরমের ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করতে নাকি বিশ্বকাপ খেলতে?

উইকেটরক্ষণ তো সবসময়ই বিশেষজ্ঞদের কাজ। সেখানে উমর আকমলের উপর ভরসা রাখা কেন? গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এর আগে কত ক্যাচ যে ফেলেছে ও! যে কারণে বিরাট কোহলির ক্যাচ যখন ফসকে যায় আকমলের হাত গলে, সেটি আমাকে অবাক করেনি মোটেও।

আমার কাছে মনে হয়েছে, নিজের শক্তি সম্পর্কে পাকিস্তান ম্যানেজম্যান্টের ধারণাটা স্বচ্ছ ছিল না। সে কারণে আট নম্বর পর্যন্ত ব্যাটসম্যান যেমন রাখতে চেয়েছে, তেমনি ষষ্ঠ বোলার খেলার সুবিধাও চায়নি মিস কারতে। বড় টুর্নামেন্টে এই মনোভাব নিয়ে খেলে সাফল্য আসবে কিনা, এ নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ।

India v Pakistan - 2015 ICC Cricket World Cup

স্বীকার করতেই হবে, পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা নিয়ে ভারতের হোমওয়ার্ক ছিল দুর্দান্ত। শিখর ধাওয়ান ও বিরাট কোহলি যেভাবে ইনিংস গড়ে তুলল, এর কোনো জবাব ছিল না মিসবাহ-উল-হকের কাছে। দুই ব্যাটসম্যানই অপেক্ষা করেছে বাজে বলের। দীর্ঘকায় উচ্চতা ও বলের গতি নিয়ে মোহাম্মদ ইরফানকে ঘিরে সরগরম আলোচনা ছিল ম্যাচের আগে। তাকেও যথাযথ সামলেছে ধাওয়ান-কোহলি। হয়তো এত বড় ম্যাচে খেলার চাপটা ঠিকঠাক সামলাতে পারেনি ইরফান। পিচের বিপদজনক এলাকায় পা ফেলার জন্য আম্পায়ার দু’বার সতর্ক করে ওকে। যে কারণে অ্যারাউন্ড দ্য উইকেটে বোলিংয়ের সুযোগ আর ছিল না। এটি ইরফানের বোলিংয়ের বিষ কেড়ে নিয়েছে অনেকখানি।

কোহলি-ধাওয়ান বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিংয়ে সচল রাখে রানের চাকা। ধাওয়ান যদি রান আউট না হত, ভারতের রান তাহলে আরো ৩০-৪০ বেশি হতে পারত। আর ওদের শতরানের জুটি ধোনিকে সামনে এনে দেয় আরেক সুযোগ। আজিঙ্কা রাহানেকে রেখে ব্যাটিং অর্ডারে সুরেশ রায়নাকে দেয় উঠিয়ে। ফলে ডানহাতি-বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের গোলকধাঁধা থেকে মুক্তি মেলেনি পাকিস্তানি বোলারদের। ইনিংসজুড়েই ব্যাপারটি নিয়ে ভুগেছে তারা। আর শর্ট বলও করেছে ওরা বড্ড বেশি। ব্যাটিং উইকেটে ফাস্ট বোলারদের জন্য সেটি খুব বাজে পরিকল্পনা।

স্পিনারদের বিপক্ষে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের আধিপত্যের ইতিহাসও ভুলে গিয়েছিল পাকিস্তান ম্যানেজম্যান্ট। একজন কিংবা দুজন না, তিন-তিনজন স্পিনার কিনা রাখল তারা একাদশে! নিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে লেগ স্পিনার ইয়াসির শাহ বিস্ময়কর কিছু করবে, এমন আশা বাড়াবাড়ি। ওর বিপক্ষে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের স্বচ্ছন্দ্যই লেগেছে বেশ।

এছাড়া হারিস সোহেলের বাঁহাতি স্পিনের ওপর নির্ভর করাটাও আরেক জুয়া। অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ডের উইকেটে শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনের বিপক্ষে ও কার্যকর হবে বলে আমার মনে হয় না। পাকিস্তানের বোলিংয়ে একমাত্র ইতিবাচক দিক ছিল সোহল খানের পাঁচ উইকেট শিকার। অবশ্য ততক্ষণে সর্বনাশ যা হওয়ায় হয়ে গেছে। দু’দুটো শতরানের জুটি গড়ে কোহলি ঠিকই তিনশর কক্ষপথে রাখে ভারতকে।

টসের সময়ই মিসবাহ বলেছিল, ইউনিস খান ইনিংস উদ্বোধন করবে। তবে প্রতিপক্ষ ৩০০ রান তুলে ফেলার পর পরিকল্পনার পরিবর্তন হবে বলে আমার আশা ছিল। দ্রুত রান তোলার স্বার্থে আহমেদ শেহজাদের সঙ্গে শহীদ আফ্রিদিকে বরং উদ্বোধনে দেখার ছিল প্রত্যাশা। দুঃখজনকভাবে ম্যানেজম্যান্ট পরিস্থিতিটা পড়তে পারেনি।

এটি তো সত্যি যে, ওয়ানডেতে ইউনিস খান অনেকদিন ধরেই ধুঁকছে। এই রূঢ় সত্যটা যত তাড়াতাড়ি মেনে নেবে, ২০১৫ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের জন্য ততই ভালো। ফর্মে ফেরার জন্য নিজস্ব টেকনিক খোঁজার চেষ্টা করছে ইউনিস, সেটি করতে গিয়ে নিজের উইকেট হারিয়েছে আজ। আপনি ওপেনার না হলে নতুন বল সামলাতে ঝামেলা হবেই। আর ফর্মে না থাকলে সে ঝামেলা বেড়ে যাবে আরো। ইউনিসের ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক তাই।

এরপরও পাকিস্তান ম্যাচে টিকে ছিল। দ্রুত রান তোলার চাপে আহমেদ শেহজাদ আউট হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে কিছুটা। এরপর টপাটপ যখন রানের খাতা খোলার আগে শোয়েব মাকসুদ ও উমর আকমল বিদায় নিল- আলৌকিক কিছু ছাড়া পাকিস্তানের জয় হয়ে পড়ে অসম্ভব। মিসবাহর ৭৬ রান তাই পরাজয়ের ব্যবধানটাই কমাতে পেরেছে কেবল।

এক দিক দিয়ে শুরুর এই হোঁচট পাকিস্তানের জন্য শাপেবর হতে পারে। মনে করে দেখুন, ১৯৯২ বিশ্বকাপেও কিন্তু টানা তিন ম্যাচ হেরেছিলাম আমরা, যার মধ্যে ছিল ভারতের বিপক্ষেও। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ট্রফি জিতেছিলাম। ভারতের সঙ্গে ম্যাচ হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের কাঁধ থেকে বোঝা নেমে যাওয়ার কথা। এখন গ্রুপে বাকি পাঁচ ম্যাচের দিকে ওরা পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া উচিত।

ওই খেলাগুলোয় পাকিস্তানের ম্যানেজম্যান্টের প্রয়োজন ঠিক একাদশ বেছে নেওয়া আর ফর্মহীন ক্রিকেটারদের বাদ দিয়ে স্পেশালিস্টদের প্রাধান্য দেওয়া। একজন-দু’জন ক্রিকেটারের চেয়ে পাকিস্তান দলের স্বার্থটা আগে দেখা উচিত সবসময়।

সূত্র: আইসিসি


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print