রবিবার , ২২ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ৯৯ তম জন্মদিন আজ

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ৯৯ তম জন্মদিন আজ

AbdulKarim-1423975665দিরাইয়ের করিম সাব। বাংলাদেশের শাহ আবদুল করিম। উজানধল, কালনী নদী, রাখাল, দুঃখ, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, বিচ্ছেদ বেদনা, অভাব-অনটন, টানাপোড়েন, কাদামাটির মানুষের বাউলগান এই নিয়ে আবদুল করিম।

শোষণ, বঞ্চনা আর নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের হৃদয় নিংড়ানো কথা স্থান পেয়েছে তার রচিত গানে। গানের কথা, সুর, তাল, লয়ে সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, প্রেম, বিরহ, অসাম্প্রদায়িক চেতনাসহ মানবজীবনের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে তার গানে।

কালজয়ী বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের জন্ম ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের  হতদরিদ্র গৃহস্থ পরিবারে। গ্রামের অন্যদশটা পরিবারের মতো ছিল না তার পরিবার। সংসারের অভাব-অনটন, নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠেন করিম। পিতা ইব্রাহিম আলী ছিলেন কৃষক আর মাতা নাইওরজান বিবি ছিলেন সাদামাটা গ্রাম্য বধূ। ইব্রাহিম আলীর ছয় সন্তানের মধ্যে করিম ছিলেন একমাত্র ছেলে, বাকি পাঁচজন মেয়ে।

উজানধল গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কালনী নদী। করিমের বাড়ি থেকে কালনীর দূরত্ব প্রায় ৫০ গজ। সারি সারি হিজল গাছ কালনীর ছোট ছোট ঢেউ যেকোনো মানুষকে বাউলদর্শনের কাছে জোর করে টেনে নিয়ে যাবে। প্রকৃতির এমন রূপ দেখে বেরসিকের কণ্ঠেও অবচেতন মনে গুন গুন গান ভেসে আসবে। গানপাগল করিমের পরিপার্শ্ব ছিল মন মাতানো রূপের। শেষ বিকেল অথবা ভরদুপুরে কালনীর তীরে বসে করিম রচনা করেছেন অসংখ্য বাউলগান।

ভাটিবাংলা খ্যাত সুনামগঞ্জের ছোট্ট উপজেলা দিরাইয়ের আবদুল করিম রচিত গান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বিধৌত ব-দ্বীপের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিয়েছে। আর তাই তো দিরাই শহরের পাঁচ-ছয় বছর বয়সের শিশুরা তাকে চেনে করিম সাব হিসেবে। বাংলাদেশের প্রবাদতুল্য  বাউল আবদুল করিম ভাটিবাংলার অপরূপ সৌন্দর্য ধারণ করেছিলেন তার হৃদয়ের গভীরে। ভাটির প্রকৃতি জল-স্থল, আকাশ-বাতাস, কাদামাটি সহজ-সরল মানুষের প্রতিকৃতি ধারণ করেছিলেন আপন সত্তায়।

সাংসারিক টানাপোড়েনে শৈশবে অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে রাখালের কাজ করেছেন করিম। মাঠে গরু রাখার কাজ করে কেটে যায় তার কিশোর জীবন। সারা দিন গরু চরিয়ে বাড়ি ফিরতেন গোধূলীতে। মাঠে গরু চরানোর সময় তিনি আপন মনে গান গাইতেন।  প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে গান তার একটি নিত্য অনুষঙ্গ। তীব্র অভাবের তাড়নায় প্রচলিত পুঁথিগত শিক্ষা গ্রহণ করা হয়নি তার। তিনি জীবনে মাত্র আট দিন বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন।

প্রকৃতি ছিল তার প্রথম শিক্ষক। প্রকৃতিই তাকে নিখাদ সোনা করে গড়ে তুলেছে। পার্থিব জীবনের প্রায় দুই যুগ ধরে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। এরপর তিনি ভর্তি হন নাইট স্কুলে। স্বাক্ষরজ্ঞান লাভের পর তিনি তার সহপাঠীদের নিয়ে গাজীর গান, বাউলা গান, ঘাটু গান, পালাগান, সারিগান, মালজোড় গান, কবিগানসহ বিভিন্ন অতি প্রাকৃতজনের গান গাইতেন। সে সময় ভাটি অঞ্চলের হাওরে নাও বাইছ  (নৌকা বাইছ)  হতো তখন করিম তার সহপাঠীদের নিয়ে নাওয়ে উঠে গাইতেন  ‘কোন মেস্তুরী নাও বানাইছে কেমন দেখা যায়  ঝিল-মিল-ঝিল-মিল করেরে ময়ূরপঙ্খী নাও’। এভাবে গানের মধ্য দিয়ে চলে তার বাউলগান চর্চা। বৃহত্তর ভাটি বাংলার সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে মালজোড় গান খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে।

দিরাইয়ের বাউল আবদুল করিম, নেত্রকোনার খ্যাতনামা বাউল উকিল মুন্সীসহ অসংখ্য খ্যাতনামা বাউলগণ নবীজীর জীবনী, পৌরাণিক যুগের কৃষ্ণের জীবনী, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, প্রেম-বিচ্ছেদ, মাটি ও মানুষের গান গেয়ে ভাটি অঞ্চলে সারা জাগিয়ে ছিলেন।  শাহ আবদুল করিমের রচিত বাউল, মুর্শিদি, জারিসারি, ভাটিয়ালি প্রভৃতি গান লোকমুখে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে । ‘শুধু কালির লেখায় আলিম হয় না মন রে কানা অজানা কে যে না জানে,আল্লাহ নবী আদম ছবি এক সূতে বাঁধা তিন জনে’  তার রচিত এ গানটির মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক যোগ সাধনার একটি ধারণা পাওয়া যায়।

মানব প্রেমের মধ্য দিয়ে জগৎ সংসারকে আলোকিত আর সমাজের নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের মুক্তির স্বাদ পাইয়ে দিতে প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন। আবদুল করিমের গানে  সাম্যবাদী ধারার সুর ফুটে উঠেছে। নির্যাতিত মানুষের শোকগাথা, শোষণ-বঞ্চনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ, শাসিত ও শোষক গোষ্ঠীর কথাই বেশি রয়েছে। ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটইতাম গ্রামের নওজোয়ান  হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম’- এ গানটির মধ্যে করিমের অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের ব্যাপ্তি ঘটেছে।

শাহ আবদুল করিম জীবনভর সাধনার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি তার একুশে পদক প্রাপ্তি। ২০০১ সালে তিনি একুশে পদক পান। এ পর্যন্ত তার প্রাপ্ত বিভিন্ন পদক ও সম্মাননার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : ‘রাগীব রাবেয়া সাহিত্য পদক ২০০০’, ‘আইডিয়া সংবর্ধনা স্মারক ২০০২’, ‘লেবাক অ্যাওয়ার্ড ২০০৩’, ‘মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা ২০০৪’ প্রভৃতি।

বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী বাউলসম্রাটের গানের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। বিলেতপ্রবাসীদের আমন্ত্রণে তিনি কয়েকবার বিলেতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন ও গান পরিবেশন করে সুনাম অর্জন করেন। সিলেট তথা বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আগরতলা, শিলচর ও করিমগঞ্জের বাঙালিদের গর্ব বাউল শাহ আবদুল করিম।

গণসংগীতশিল্পী হওয়ার সুবাদে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাদের জনসভায় গণসংগীত পরিবেশন করে তিনি জনগণকে মুগ্ধ করতেন।

বাউল করিমের প্রথম গানের বই ‘আফতাব সঙ্গীত’ পঞ্চাশ দশকের গোড়ার দিকে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় বই গণসংগীত প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। তৃতীয় বই ‘কালনীর ঢেউ’ ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয়। ১৫৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটিতে মোট ১৬৩টি গান রয়েছে। প্রতিটি গানেই জগৎ ও জীবন সম্পর্কে লেখকের আত্ম প্রতীতির স্বাক্ষর বিদ্যমান, যা সহজেই সহৃদয় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চতুর্থ বই ধলমেলা প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। পঞ্চম বই ‘ভাটির চিঠি’ প্রকাশ হয় ১৯৯৮ সালে। বাংলাদেশের অন্যতম পুরস্কার একুশে পদক পেয়েছেন তার অনবদ্য সৃষ্টিশীল রচনার জন্য ।

১৯৫৪-এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে, ৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে, ৭১-এর মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে, ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি জনতার সমুদ্রে স্বরচিত গণসংগীত পরিবেশন করেন। গণমানুষের আন্দোলন সংগ্রামে মানুষকে উজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুক্তফ্রন্টের সময় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে গান পরিবেশন করেছেন বাউল আবদুল করিম। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উপস্থিতিতে সিলেটে আয়োজিত সমাবেশে তার দরাজ কণ্ঠে গেয়েছিলেন স্বরচিত বিভিন্ন গান। মানুষের দুঃখ শোকের অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার পরিবেশিত এ গানটির মধ্য দিয়ে ‘এবারে দুর্দশার কথা, কইতে মনে লাগে ব্যথা’। বাঙালি জাতির মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গান পরিবেশন করেছেন।

ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে করিম গেয়েছিলেন ভাসানীকে নিয়ে স্বরচিত গান ‘জনাব মওলানা ভাসানী, কাঙালের বন্ধু তিনি চিন্তা করেন দিন রজনী’।

বাউল করিম ৩৮ বছর বয়সে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের আশাসুরা গ্রামের আবদুর রহমানের মেয়ে সরলা খাতুনকে বিয়ে করেন। ১৩৯৬ বাংলায় সরলা খাতুন একমাত্র ছেলে শাহ নূরজালাল ও বাউল করিমকে রেখেই মারা যান। বাউল করিমের সুযোগ্য উত্তরসূরি তার পুত্র নূরজালালও বাবার শেখানো পথ ধরেই হেঁটে চলছেন।

বাউল আবদুল করিমের শেষ ইচ্ছা তার গ্রামের বাড়িতে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করা।

 #


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print