সোমবার , ২৩ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » জাতীয় » গ্যাস-বিদ্যুতের দাম আপাতত বাড়ছে না

গ্যাস-বিদ্যুতের দাম আপাতত বাড়ছে না

গ্যাস-বিদ্যুতেআপাতত বাড়ছে না গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম। মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর শুনানী শেষ হলেও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) থেকে দাম বাড়ানো বা সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত সহসাই আসছে না।

এর আগে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবনার ওপর গণশুনানী শেষে এক সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে দাম সমন্বয়ের (বৃদ্ধি) সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছিল কমিশন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিইআরসির একজন কর্মকর্তা জানান, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এই মুহূর্তে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোই শ্রেয় বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। আপাতত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য না বাড়িয়ে বর্তমান দামই কার্যকর রাখতে চায় সরকার।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের টিসিবি ভবনের বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) গত ২০ থেকে ২৫ জানুয়ারি বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব এবং ২ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানী অনুষ্ঠিত হয়।

গত ২০ জানুয়ারি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর শুনানীর প্রথম দিন বিইআরসির সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এর পর ২৫ জানুয়ারি তিনি বলেন, ‘সাধারণত গণশুনানী শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। আজ (২৫ জানুয়ারি) বিদ্যুতের ওপর গণশুনানী শেষ হল। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্তটা জানানো যাবে।’

বিইআরসির সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ এ ব্যাপারে বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু এটা হচ্ছে না। কারণ বিদ্যুতের শুনানীর পর তো গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপরও শুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিদ্যুতের সঙ্গে গ্যাসের বা গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুতের দাম বাড়া -কমার সম্পর্ক রয়েছে। তাই সবকিছু পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর (বিদ্যুৎ-গ্যাস) কাছে বিভিন্ন কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। হয়তো আরও কাগজপত্র চাওয়া হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করতে এবার একটু সময় লাগবে।’

কতদিন সময় লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার (যে সব কাগজ চাইবে বিইআরসি) তিন মাসের মধ্যে এর সমাধান হবে। তাই ঠিক কবে নাগাদ হচ্ছে তা বলা যাচ্ছে না।’

তবে কি বলা যায় তিন মাসের মধ্যে দাম সমন্বয় হচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, ‘তা আমি বলছি না। তবে এ মাসে (ফেব্রুয়ারি) যে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় হচ্ছে না তা বলতে পারি।’

গত ২০ থেকে ২৫ জানুয়ারি কারওয়ান বাজারের টিসিবি ভবনে বিইআরসিতে বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন কোম্পানিগুলোর পাইকারি, খুচরা ও সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানী অনুষ্ঠিত হয়। শুনানীতে বিতরণ কোম্পানিগুলো প্রস্তাবিত পাইকারি দাম ১৮.১২ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিবেচনায় ১৭ থেকে ২৫.৮৯ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখে। দুটি বিতরণ সংস্থার সামান্য বৃদ্ধির সুপারিশ থাকলেও অন্যদের প্রস্তাব নাকচ করে দেয় বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।

পাইকারি দাম বাড়লে (প্রস্তাবিত ৫.১৬ শতাংশ) বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ৭.৮৩ শতাংশ এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) ২.২৮ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। অন্যান্য কোম্পানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন নেই বলে মত দেয় মূল্যায়ন কমিটি।

গত ২ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ওপর বিইআরসিতে গণশুনানী অনুষ্ঠিত হয়। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো গড়ে ৪০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। তবে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্য ১২২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করে কোম্পানিগুলো। বর্তমানে মাসিক এক চুলা ৪০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা এবং দুই চুলা ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করার প্রস্তাব করে কোম্পানিগুলো।

তবে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (বিজিডিসিএল) গ্যাসের মূল্য ২.৪৯ শতাংশ ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল ) গ্যাসের মূল্য ৫.৫৯ শতাংশ এবং জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের (জেজিটিডিসিএল) গ্যাসের মূল্য ৪.৯৮ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করে। বিতরণকারী তিন কোম্পানি তিতাস গাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (টিজিটিডিসিএল), কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল) ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়বে না বলে সুপারিশ করে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির ওপর গণশুনানী গ্রহণ করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান এ আর খান, সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ, প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন, রহমান মুরশেদ ও মাকসুদুল হক।

গণশুনানীতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবের যৌক্তিতা খণ্ডন করে বক্তব্য রাখেন- কনজ্যুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানী উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম, বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানী তেলের দাম কমছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব অযৌক্তিক। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবনার বিরোধিতা করে ক্যাবের জ্বালানী উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের আইনগত ভিত্তি নেই। কোম্পানিগুলো প্রচুর পরিমাণে মুনাফা করছে। পশ্চিমাঞ্চলের কর্মচারীরা ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা এবং তিতাস গ্যাসের কর্মচারীরা প্রায় দুই লাখ ও কর্ণফুলীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পৌনে তিন লাখ টাকা করে প্রফিট বোনাস পেয়েছেন। তাদের আরও কত টাকা বোনাস দেবে?
শামসুল আলম বলেন, কোম্পানিগুলো ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ হচ্ছে। জনগণের ব্যয় আর না বাড়ানোর অনুরোধ করছি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানী তেলের মূল্য কমায় বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে প্রতি হাজার ঘনমিটার গ্যাস ২৫ টাকা সম্পদ মূল্য ধরে গ্যাস কোম্পানিগুলো মূল্যহার বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে যে আবেদন করেছে তাকে অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে আবেদন প্রক্রিয়াটিকেই খারিজের আবেদন করেছেন ক্যাবের জ্বালানী উপদেষ্টা শামসুল আলম।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের মার্চ মাসে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। আর আবাসিক গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয় ২০০৯ সালে।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print