শনিবার , ২১ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » সরকারি » আতঙ্কের নাম ‘বন্দুকযুদ্ধ’

আতঙ্কের নাম ‘বন্দুকযুদ্ধ’

imagesপ্রথমে গ্রেপ্তার ও অথবা সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়া, পরে অভিযান, অতপর কথিত বন্ধুকযুদ্ধ। কোনো নর্দমা, খাল, বিল অথবা হাসপাতালের মর্গে মিলছে সেইসব মৃতদেহ।পরে খবর পেয়ে স্বজনরা গিয়ে লাশ শনাক্ত করছেন। মূলত গত ৫ জানুয়ারির পর থেকেই এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৩১ জন এমন এভাবে নিহত হয়েছে।

অবশ্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বোমা উদ্ধার বা আস্তানায় অভিযান চালানোর সময় সহযোগীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে এসব ‘দুর্বৃত্ত’। যদিও এদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক নেতাকর্মী।

অপরদিকে নিহতের পরিবার থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, পুলিশ সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করছে। এমনকি কথিত বন্ধুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে এমন অনেকেরে বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি)পর্যন্ত নেই।

এমনই বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের জন্য র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত। তখন বলা হতো ক্রসফায়ার। তবে এবার জড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী। তবে একে বলা হচ্ছে ‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত’।

এমন হত্যাকাণ্ডের শিকার জসিম উদ্দিন নামের এক মাদরাসা ছাত্র। পরিবারের দাবি, গত শনিবার দুপুরে তাকে রাজধানীর তালতলা এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরের দিন সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে গিয়ে তার গুলিবিদ্ধ লাশ শনাক্ত করেন নিহতের বড় ভাই আনিসুর রহমান।

আনিসুর জানান,তার ভাই রাজধানীর কাজীপাড়া এলাকার একটি মাদরাসায় ফাজিল শ্রেণীতে পড়াশুনা করতো। তাদের গ্রামের বাড়ি বরিশালের কুন্দিয়ালে।

জসিম ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই মাদরাসায় পড়াশুনা করেছে। সে সুবাদে হতেও পারে। তবে আমি তা নিশ্চিত না।’

শুধু জসিমই নন, অবরোধ-হরতালের গত ৫ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩১ দিনে অন্তত ২৭ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। যাদের বেশিরভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন এবং জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।এ তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

তবে মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসেই বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১৭ জন। এর বাইরে চলতি মাসের নয় দিনে আরও অন্তত ১৩ জন বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

এদিকে সোমবারও দু’টি গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্বার করেছে পুলিশ। তবে এখনো নিহতের পরিচয় জানা যায়নি। গতকাল রোববারেও এমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন আরো দু’জন। এদের মধ্যে একজন যশোরে, যার নাম রাজু ওরফে ভাইপো রাজু। আর অন্যজন কুমিল্লায়, যার নাম কালা স্বপন। এর মধ্যে রাজু র‌্যাবের হাতে এবং কালা স্বপন পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে। একই দিন মিরপুর থেকে এক মাদরাসা ছাত্রের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার করলেও বন্দুকযুদ্ধের বিষয়টি স্বীকার করেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বলছে, গত সাত দিনে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৬ জন। এর মধ্যে ‘সরাসরি ক্রসফায়ারের’ শিকার হয়েছেন অন্তত ১১ জন। বাকি পাঁচ জনের মধ্যে তিনজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর দু’জন পুলিশভ্যান থেকে পালাতে গিয়ে ট্রাকচাপায় নিহত হয়েছে বলে দাবি করছে পুলিশ। যদিও তাদের পরিবারের দাবি আগেই আটক করা হয়েছিল তাদের।

এসব বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন আরো অনেকেই। গত জানুয়ারি থেকে এমন ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সহিংসতা বন্ধে অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্যের পর ‘বিচাবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড’ বেড়ে গেছে বলেও মানাবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি।

ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)এসব কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সাম্প্রতিক বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধীকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বাংলামেইলকে বলেন, ‘এ বিষয়টি নিয়ে বরাবরই আমার অবস্থান স্বচ্ছ। যে যা কিছু আইনের লঙ্ঘন, সেটাই বেআইনি বা বিচারবহির্ভুত কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য। যদি কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে, তাহলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করাটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

তিনি আরো বলেন, ‘কাউকে বোমা হাতে দেখলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অস্ত্র হাতে তুলে নেবে। হ্যাঁ, তারা (প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা) যেটা বলছে সেটার সাথে আমিও একমত। তবে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া মানেই তো তাকে মেরে ফেলা না। অপরাধীর পায়ে বা অন্য কোথাও গুলি করা যেতে পারে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এই মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ যে দাবি করা হচ্ছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বন্দুকযুদ্ধের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা থাকতে হবে। যদি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট বহিনী না দিতে পারে তাহলে সেটাকে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড বলে।’

এ ব্যাপারে মানবাধিকার ব্যুারোর মহাসচিব ড. মো. শাজাহান খান বংলামেইলকে বলেন, ‘একজন মানবাধিকারকের্মী হিসেবে যে কোনো বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এভাবে কখনো কোনো সমস্যর সমাধান হবে না। সমাজের দুষ্টুক্ষত বাড়বে। সামাজিক ন্যায়বিচার কখনো প্রতিষ্ঠিত হবে না, বরং আতঙ্ক সৃষ্টি হবে।’

তিনি আরো, ‘রাজনৈতি স্থিতিশীলতা না এলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। আর মানবাধিকার না হলে আইনের শাসন আসবে না। আর এই আইনের শাসন না হলে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। সুশাসন ছাড়া গণতন্ত্র কখনোই শক্তিশালী হবে না।’
প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকেও দায়মুক্তির একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানান তিনি। একই সঙ্গে বর্তমান সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংলাপই একমাত্র পথ বলে মত দেন এই মানবাধিকার কর্মী।

পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে একের পর এক রাজনৈতিক কর্মী নিহত হওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘যখন কেউ পুলিশের ওপর হামলা চালাতে চেষ্টা করে, তখন আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালাবে। এটা আইনের কথা। সম্প্রতি সময়ের সহিংস অবস্থা নিরসনে আমরা রাজধানীজুড়ে অভিযান চালাচ্ছি। অনেক সময় দেখা যায়, দুর্বৃত্তরা আমাদের ওপরও হামলা চালায়। তখন আত্মরক্ষার্থেই গুলি করা লাগে।’

তবে পুলিশের হাতেই আটক কেউ যখন পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে- এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print