সোমবার , ২৩ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা: ফাঁসলেন দুদকের ৪ কর্মকর্তা

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা: ফাঁসলেন দুদকের ৪ কর্মকর্তা

Dudok-1-1422419313যুদ্ধ না করেও যারা মুক্তিযোদ্ধা সেজে বাড়তি সুবিধা নিয়েছেন বা নেওয়ার অপচেষ্টা করেছেন, এবার সে তালিকায় যোগ হতে যাচ্ছেন দুদকের মহাপরিচালকসহ (ডিজি) চার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। সরষের ভূত তাড়াতে অবশেষে চূড়ান্ত পথে হাঁটছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানের ডিজিসহ আট কর্মকর্তার মুক্তিযোদ্ধা সনদ জালিয়াতির অভিযোগের অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে জমা দিয়েছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। যেখানে অনৈতিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন দুদকের মহাপরিচালক (ডিজি) কামরুল হাসান মোল্লা, পরিচালক আবদুল আজিজ ভূঁইয়া ও উপপরিচালক ঢালী আবদুস সামাদ।

অন্যদিকে অপর পরিচালক গোলাম ইয়াহিয়ার অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন ২০১৪ সালের ১৬ নভেম্বর। এরই মধ্যে অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে স্বেচ্ছায় কমিশন পদত্যাগ করেছেন ওই পরিচালক।

এদিকে দুদকের অনুসন্ধানে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি তাদের নাম ও মুক্তিবার্তা পত্রিকা অনুসারে তাদের ক্রমিং নম্বরগুলো হলো- উপপরিচালক এস এম গোলাম মাওলা সিদ্দিকী (০১১৮০১০২৭৫) ও প্রাক্তন উপপরিচালক রঞ্জন কুমার মজুমদার (০১১৫০২০১১৭), সহকারী পরিদর্শক (পিআরএল ছুটি ভোগরত) আবদুস সোবহান(০২১১০৪০১৮৮), কোর্ট সহকারী (এএসআই) নুরুল ইসলাম (০১১৭১৩০০৬০) ও ইসহাক ফকির (০১১৬০৭০০৭৬)।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে জানান, অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জুলফিকার আলী অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে জমা দিয়েছেন। এতে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করছেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। বাকি সিদ্ধান্ত কমিশন নেবে।

প্রতিবেদন অনুসারে অনৈতিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন এমন কর্মকর্তাদের বিষয়ে জানা যায়-

 

দুদকের মহাপরিচালক (ডিজি) কামরুল হাসান মোল্লা:

দুদকের এই ডিজির স্কুল সার্টিফিকেট অনুসারে জন্মতারিখ দেওয়া রয়েছে ১৯৬০ সালের ১ জানুয়ারি। ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়েই তার বয়স ছিল ১১ বছর ১১ মাস। কিন্তু জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য ১৬ বছর বয়স হওয়ার যে বাধ্যবাধকতা তা পূরণ করে না। এ ছাড়া চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় দাখিলকৃত কাগজপত্রের কোথাও তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেননি। তার দাবি অনুসারে লাল মুক্তিবার্তায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম খুঁজেও পাওয়া যায়নি। ভারতের দেওয়া তালিকায়ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এমনকি ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর সরকার কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্রে দুদকের ডিজির নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পরবর্তী সময়ে তার নামে পৃথকভাবে ২০১১ সালের ৬ মার্চ গেজেট প্রকাশিত হয়। তবে সেই মুক্তিযোদ্ধা সনদে নেই প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর।

 

দুদক পরিচালক আবদুল আজিজ ভূঁইয়া:

১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর আবদুল আজিজ ভূঁইয়ার বয়স ছিল ১৩ বছর ৩ মাস। যা জামুকার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য ১৬ বছর বয়সের বাধ্যবাধকতা পূরণ করে না। এ ছাড়া চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় দাখিলকৃত কাগজপত্রের কোথাও তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেননি।

তার বিরুদ্ধে গুরুতর আরো যে অভিযোগ তা হলো, তিনি তার দাখিলকৃত মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্রে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর জাল করেছেন। দুদকের অনুসন্ধানেও মিলেছে অভিযোগের সত্যতা।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচালক আবদুল আজিজ যে সনদ প্রদর্শন করেন, তার ক্রমিক নম্বর হলো- ৪৯৭১৯। অথচ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ইস্যুকৃত সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা সনদের ক্রমিক নম্বর হলো ৪৭৯৩১। অর্থাৎ তার দাখিলকৃত মুক্তিযোদ্ধা সনদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষর জাল।

 

দুদকের উপপরিচালক ঢালী আবদুস সামাদ:

স্কুল সার্টিফিকেট অনুসারে ঢালী আবদুস সামাদের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি। এই কর্মকর্তার বয়স ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বরে ছিল ১৫ বছর ১১ মাস। যা জামুকার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য ১৬ বছর বয়সের বাধ্যবাধকতা তা পূরণ করে না।

এ ছাড়া তার দাখিল করা মুক্তিযোদ্ধা সনদে (মুক্তিবার্তার নম্বর) যে নম্বর দেওয়া রয়েছে দুদকের অনুসন্ধানে যা ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। ২০১০ জামুকা কর্তৃক প্রকাশিত পরিপত্রেও তার নাম পাওয়া যায়নি।

 

পরিচালক গোলাম ইয়াহিয়া :

সদ্য প্রাক্তন গোলাম ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধেও অনৈতিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। স্বেচ্ছায় অবসরে নেওয়া এই পরিচালকও চাকরি নেওয়ার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেননি। যার দায় নিয়ে ওই পরিচালকও সরকারের কাছ থেকে নেওয়া বাড়তি অর্থ ইতিমধ্যে কমিশনকে ফেরত দিয়েছেন। ২০১৪ সালের নভেম্বরে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দিলেও এখন পর্যন্ত কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

দুদক সূত্রে জানা যায়, কমিশনের নিজের নয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ জালিয়াতির এ অভিযোগ ২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর কমিশনের মাসিক সভায় উত্থাপিত হয়। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করে কমিশন এতে অনুমোদন করলে ২২ অক্টোবর দুই সদস্যের একটি অনুসন্ধানকারী টিম গঠন করে অনুসন্ধান শুরু করা হয়।

অনুসন্ধানদল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে অভিযুক্তদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন, নামের সনদ, মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত নাম ও সংশ্লিষ্ট যাবতীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে। এ ছাড়া ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সার্ভিস বুকের যাবতীয় তথ্য যাচাই ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

অনুসন্ধানদলের নেতৃত্বে রয়েছেন দুদকের উপপরিচালক জুলফিকার আলী। টিমের অন্য সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক এস এম রফিকুল ইসলাম।

 #


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print