সোমবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
মূলপাতা » সাহিত্য আসর » উত্তরাধুনিক চিন্তার সৈনিক জগলুল হায়দার

উত্তরাধুনিক চিন্তার সৈনিক জগলুল হায়দার

সোহেল অটল ::

318827_270129183011035_378382799_n

জগলুল ভাই এবং আমার বয়সের ফারাক কমপক্ষে ১৭ বছর। ১৭ বছর ফারাকের অনেক বাপ-বেটাও দেখেছি। সেই অর্থে জগলুল ভাই এবং আমার বয়সের ফারাক বাপ-বেটা সমতুল্য বললে ভুল হয় না।


আসলেই কি তাই? এই ৮ অক্টোবরে জগলুল হায়দার ৫০ বছরে পা দিলেন। কিন্তু বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার মন উল্টোদিকে হাঁটছে। জগলুল ভাই একাধারে তার বড় ভাইদের বন্ধু, বন্ধুদের বন্ধু, ছোট ভাইদের বন্ধু, ছোট ভাইয়ের ছোট ভাইদেরও বন্ধু। নিজের মনটাকে একটা নির্দিষ্ট বয়সে বেঁধে ফেলেছেন তিনি। সেটা ২০ থেকে ৩০ এর মধ্যে। আমার মতে, এটা জগলুল ভাইয়ের চরিত্রের উল্লেখযোগ্য দিক।


দীর্ঘদিন ধরে জগলুল ভাইয়ের সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা-রাত পার করছি। তার চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে আমি বেশ পরিচিত। সত্যি বলতে জগলুল ভাইয়ের চিন্তা-ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই আমাকে প্রভাবিত করে। আমি জানি, আামার মতো আরো অনেককেই সেটা করে। সেই চিন্তা-ভাবনার বহুমুখী দিক আছে। তার সব আলোকপাত করা সম্ভব নয়। আমি নির্দিষ্ট কয়েকটা বিষয় উল্লেখ করার চেষ্টা করব।


জগলুল হায়দার পেশাদার ছড়াকার। সম্ভবত নেশাদারও। ছড়াকে তিনি নেশার মতোই নিয়েছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় ছড়াকার হিসেবে চারদিকে তার অনেক গুণকীর্তন শুনি। আমি ছড়া বুঝি না। তবে ছড়াকার হয়তো বুঝি। তাই জগলুল হায়দারকেও কিছুটা বুঝি। দেশের ইতিহাসে উত্তরাধুনিক ছড়ার পথিকৃত বলা হয় তাকে। আরো আছে। বিজ্ঞান ছড়ার জনক, ছড়ার হিরো এমন অনেক বিশেষণ আছে তার নামের আগে। আমি সহজভাবে যেটা বুঝি জগলুল হায়দার দেশের ছড়ার জগতে আলোক বর্তিকা। এর মানে এই নয় যে তার আগে ছড়ার ইতিহাস অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। ছড়ার গ্যালাক্সিতে জগলুল হায়দার একটা আলাদা নক্ষত্র। সেটা অবশ্যই উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরণকারী।


কবি মানে দ্রষ্টা। ভূত-ভবিষ্যত ব্যাখ্যাকারী। ভালো-মন্দের পার্থক্য বিশ্লেষণকারী। জগলুল হায়দারও তাই। অন্তত আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ তা-ই বলে। গতানুগতিক ছড়া চর্চার বাইরে জগলুল হায়দার ছড়াকার-কবি হয়ে উঠেছেন তার পরিস্কার সমাজচিন্তা, রাষ্ট্রচিন্তা ও ধর্মচিন্তার মাধ্যমে। খুব কাছে থাকার সুবাদে সেসব চিন্তাকেও অনুধাবন করার সুযোগ হয়েছে। সেই চিন্তার বেশিরভাগই আমাকে প্রভাবিত করেছে।


আমার এক কাজিন আছেন। নাম মনিরুল ইসলাম। আমি সেজদা বলে ডাকি। ছোটবেলায় কোনো প্রশ্নের উত্তর না পেলে তার কাছে ছুটে যেতাম। আমার প্রচণ্ড বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীর সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সেজদা জানেন। সেজদাও নিরাশ করতেন না। ঠিকই আমার সব প্রশ্নের একটা উত্তর দিতেন। বড় হয়ে বুঝলাম একটা মানুষের পক্ষে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব না। যিনি অনেক জানেন, তিনি অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। যিনি কম জানেন, তিনি কম উত্তর দেন। এখন ইন্টারনেটের যুগ। গুগল মামাকে জিজ্ঞেস করলেই পৃথিবীর প্রায় সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানিয়ে দেয়। তবুও একজন মানুষ দরকার ছিল আমার যার মুখ থেকে জিজ্ঞাসার উত্তর মিলবে। জগলুল ভাইয়ের সঙ্গে চলতে চলতে এক সময় আবিস্কার করলাম তিনিই সেই ব্যক্তি। ঠিক ঠিক গুগল মামার মতো আমার অজানা সমস্ত প্রশ্নের একটা উত্তর তিনি জানেন। অন্তত উত্তরের একটা ধারণা দিতে পারেন।


জগলুল হায়দারের একটা গুণের সঙ্গে অনেকেই পরিচিত নন। তিনি গান তো লেখেনই, অনেক ভালো সুরও করেন। তার লেখা ও সুরে গান গেয়েছেন মনির খানের মতো প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। গানের মাধ্যমে উত্তরাধুনিক চিন্তা ছড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা ছিল জগলুল ভাইয়ের। দেশের সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন চেষ্টা এর আগে দেখা যায়নি। সম্প্রতি তিনি নিজেই সেসব গান কণ্ঠে ধারণ করেছেন। উত্তরাধুনিক চিন্তাকে সুরের মাধ্যমে নিজেই ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। তার গান গাওয়ার ক্ষমতাও অনেককে অবাক করবে বলে আমি আশা করছি।
বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে জগলুল হায়দারের দৃষ্টিভঙ্গি তার উত্তরাধুনিক চিন্তাভাবনারই ফসল। চারদিকে ‘বাংলা ভাষার বারোটা বাজলো’ বলে যখন রব উঠছে, তিনি তখন ‘চলতি’ বাংলার দিকেই ঝুকলেন। যেটাকে তিনি বলেন ঢাকা ভিত্তিক কথ্য-মান। শান্তিনিকেতনি ভাষাকে বয়কট করলেন এক প্রকার। সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিতরা এই চলিত বাংলায় কথা বলতে হীনমন্যতায় ভোগে। কিন্তু জগলুল হায়দার শুধু আড্ডাতেই এই চলিত বাংলা ঝাড়েন না, লেখালেখিতেও তার প্রভাব স্বরূপে বিদ্যমান। তার মতে, যে ভাষায় আমার বলতে-বুঝতে সুবিধা হয়, সেটাই আমার জবান। সেটাই নিজের ভাষা হওয়া উচিত। সেটাতেই আমরা সহজাত।


একেশ্বরবাদী জগলুল হায়দারের ধর্মবিশ্বাসও ধর্মানুরাগীদের জন্য অণুকরনীয় হতে পারে। জন্মগতভাবে তিনি মুসলমান। অসাম্প্রদায়িক এই মানুষটির ইসলামের প্রতি ভক্তি লক্ষ্য করার মত। সেই ভক্তিতে বিন্দুমাত্র কমতি নেই যেমন, বাহুল্যও নেই কিছু। তার ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মচর্চা দেখলে নতুন করে মনে হয় ইসলামই সর্বশেষ এবং সর্বাধুনিক ধর্ম। আমার প্রবল বিশ্বাস এই ধর্মচিন্তা তার উত্তরাধুনিক চিন্তারই ধারাবাহিকতা।


ছড়াকার, কবি, প্রবন্ধকার, গীতিকার, সুরকার একটা মানুষের এতগুলো গুণ থাকা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। হয়তো জগলুল ভাইও কারো না কারো ঈর্ষার পাত্র। এত কিছুর পরও মানুষ হয়ে ওঠার জন্য যেসব মানবিক গুনাবলী থাকার দরকার, জগলুল ভাইয়ের মধ্যে সেসবও শক্তভাবে বর্তমান। আর কিছু না হোক, মানুষ হিসেবে তিনি ঈর্ষণীয় আমার কাছে। তবে সেই ঈর্ষাকেও জয় করার ক্ষমতা রয়েছে জগলুল ভাইয়ের। মানুষের সুখে-দুঃখে নিজেকে জড়িয়ে নিতে পারার অপার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছেন ভদ্রলোক। এটা ঈর্ষা করার মতোই। জগলুল হায়দারের ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এটাই আশা করি যেন এই ঈর্ষা সারাজীবন করতে পারি।

লেখক: সাংবাদিক


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print