মঙ্গলবার , ১৪ আগস্ট ২০১৮
মূলপাতা » বেসরকারি » এবার পুলিশের পদোন্নতি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস!

এবার পুলিশের পদোন্নতি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস!

পুলিশেপুলিশ বাহিনীতে বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের চাঞ্চল্যকর খবর পাওয়া গেছে। গত ৫ ডিসেম্বর কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে সারাদেশে একযোগে পদোন্নতি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে খুলনা রেঞ্জে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি প্রথম ধরা পড়ে। ওই রেঞ্জের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে নড়াইল জেলার পুলিশ সুপার আবদুল কাদেরসহ অন্তত ৮০ জন বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্য জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল (পিআরবি) ও বিশেষ বিধান আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একই পরীক্ষায় দেশের আরও কয়েকটি জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বাতিল করা হয় ওই পরীক্ষা। পরে নতুনভাবে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়, কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদোন্নতির পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা এটাই প্রথম বলে জানা যায়।

বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি জানাজানি হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। এর পর গঠন করা হয় উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। কমিটি এরই মধ্যে শতাধিক বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের নাম উঠে আসে। এ ছাড়া আগামীতে পুলিশে পদোন্নতি পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা পুনর্বিন্যাসে প্রাথমিক কিছু সুপারিশ করেছে কমিটি। সেখানে বলা হয়_ প্রচলিত পদ্ধতিতে পুলিশের পদোন্নতি পরীক্ষায় সারাদেশে বর্তমানে অন্তত ১০০টি সেন্টারে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামীতে পরীক্ষা সেন্টার কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়, যাতে আরও সুচারুভাবে অধিক নিরাপত্তারমধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার দুই ঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ করার কথা বলা হয়। এমনকি পরীক্ষা শুরুর অল্প সময় আগে ই-মেইলে সব সেন্টারে প্রশ্নপত্র পেঁৗছে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।এ ব্যাপারে নড়াইলের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে নড়াইলের বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্ত কমিটি। যে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, সেটি বাতিল করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হবে।তবে মূল অভিযুক্ত নড়াইলের এসপি আবদুল কাদের ছুটিতে দেশের বাইরে থাকায় এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গত ২৭ ডিসেম্বর দেশব্যাপী পুলিশের কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষার প্রথম ধাপ শুরু হয়। প্রধানত দুটি ধাপে এই পরীক্ষা হয়ে থাকে। প্রথমটি হয় বইসহ। আর দ্বিতীয় ধাপে বই ছাড়া পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ৫ ডিসেম্বর। লিখিত দুটি পরীক্ষার মোট নম্বর ১০৫। লিখিত পরীক্ষায় ৫০ শতাংশ নম্বর পেলে কৃতকার্য বলে গণ্য করা হয়। এর বাইরে প্যারেড, চাকরির সময়সীমা, চাকরিরত অবস্থায় পুরস্কারসহ কিছু বিষয় মিলে পদোন্নতি পরীক্ষার মোট নম্বর ১২৫। সব মিলিয়ে ৭৫ শতাংশ নম্বর পেলে কোনো শিক্ষার্থী চূড়ান্তভাবে কৃতকার্য বলে গণ্য হন। তবে অনেক সময়ই পরীক্ষার্থীরা বইবিহীন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে থাকেন। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে পুলিশের পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই।

গত ৫ ডিসেম্বরের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি ধরা পড়ে। খুলনা রেঞ্জের পরীক্ষায় সাতক্ষীরায় একজন পুলিশ সদস্য নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েন। ওই পুলিশ সদস্যের কাছে পরীক্ষায় আসা সব প্রশ্নের উত্তরের হুবহু কপি পাওয়া যায়। এর সূত্র ধরে শুরু হয় তদন্ত। এর পর প্রযুক্তিগত তদন্তে উঠে আসে পুরো প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে পুলিশের কোন পদমর্যাদার সদস্য, কী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন। এমনকি প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে নড়াইলের পুলিশ সুপারের যোগসূত্রের বিষয়টি পাওয়া যায়। কোনো কোনো পুলিশ সদস্য অবৈধ এ প্রক্রিয়ায় জড়িত হয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হন। তবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার রমরমা বাণিজ্য শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জড়িতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন একজন এসআই, কনস্টেবল আটজন এবং বাকিরা এএসআই। বাকিদের বিরুদ্ধে পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে নড়াইলের এসপি, পরিদর্শক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার অন্তত ৭০ জন পুলিশ সদস্য আছেন।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুধু খুলনা রেঞ্জে কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদোন্নতির পরীক্ষায় অন্তত দুই হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নেন। নড়াইল থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর প্রথমে তা খুলনা রেঞ্জের অনেক পরীক্ষার্থীর হাতে পেঁৗছে। এমনকি মোবাইল ফোনে একে অন্যকে প্রশ্ন জানিয়ে দেন।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সামনে পুলিশ বাহিনীতে আরও সদস্য নিয়োগ হতে পারে। এতে পদোন্নতির জন্য শূন্য পদ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই আগামীতে পদোন্নতির জন্য অনেকেই বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস হতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি পরীক্ষায় পাস হওয়ার পর পরে শূন্য পদে কৃতকার্যদের পদায়ন করা হয়।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print