মঙ্গলবার , ১৯ জুন ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » পর্দাহীনতা ইভটিজিংয়ের অন্যতম কারণ

পর্দাহীনতা ইভটিজিংয়ের অন্যতম কারণ

আমরা মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব। তাই সমাজে সামাজবদ্ধভাবে বসবাস করে থাকি। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে সমাজিক বিধি-বিধান ও ইসলামী নীতিমালাসহ অনেক  আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতি মেনে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সমাজে, আধুনিক সভ্যতার দোহাই দিয়ে নানা রকম অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার এবং অসামাজিক কার্যকলাপ বিরামহীনভাবে চলছে। সে সব অপসংস্কৃতির মধ্যে অন্যতম মূল কারণ হলো ইভটিজিং। ইভটিজিং একটি সামাজিক মরণব্যাধি। সমাজ জীবনে এটি একটি  জঘন্যতম অপরাধ। এই মরণব্যাধি থেকে আমরা মুক্তি পেতে চাই। পরিত্রাণ পেতে চাই।
পাশ্চাত্যের অপ-সংস্কৃতির করাল গ্রাস থেকে ইভটিজিং নামক এই মরণব্যাধিটির উৎপত্তি। এই মরণব্যাধির দ্বারা মুসলিম জাতিকে ধ্বংস করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সারা বিশ্বে যত ইসলামবিরোধী শক্তি রয়েছে, তারা সবাই ইভটিজিং নামক এ মরণব্যাধিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আমাদের দেশে একটি মুসলিম দেশে। এখানে ইভটিজিং নামক এই অপ-সংস্কৃতিকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশে ইভটিজিং ছেড়ে  দেয়ার  মূল কারণ একটাই যে, আমরা মুসলিম। তারা মনে করেন, মুসলিম নারী সমাজকে যদি ইসলামের সুশীতল ছায়া এবং ইসলামের সুমহান জীবনার্দশ থেকে বের করে আনা, চরিত্রহীনভাবে গড়ে তুলে যদি নষ্ট ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করা যায়, তাহলে নারীকে ধ্বংস করা খুবেই সহজ হবে। নারীর চরিত্র ধ্বংস মানে সব কিছু ধ্বংসা করা অতি সহজ। নারীদেরকে ইসলামী বিধিবিধান পালন করা থেকে বিরত রাখতে পারলেই হলো। তাই ইসলাম বিরোধী শক্তিরা ইভটিজিং নামক মরণব্যাধিকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং সেই আলোকে তারা সব ধরনের কাজকর্ম চালিয়ে  যাচ্ছে।
ইভটিজিং নামক অপসংস্কৃতি শুধু পাশ্চাতের গণ্ডির  মধ্যে নয়, এর ভয়াবহ পরিণাম বর্তমানে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে স্কুল-কলেজের ছাত্রী, শিক্ষিকা এবং ঘরের মা-বোনেরা বোকাটেদের হাতে নিত্যদিনে নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। এ জঘন্য ব্যাধির কারণে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, পারিবারিক কলহ-বিবাদ এমনকি আত্মহত্যার মতো মর্মঘাতী ঘটনা নিয়মিত ঘটে যাচ্ছে । এসব অঘটন ঘটার মূল কারণ হচ্ছে, বর্তমানে নারীরা পর্দাহীনভাবে চলাফেরা করছে। পর্দা প্রথা লঙ্ঘন করছে। প্রিন্ট ম্যাডিয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নিয়মিতভাবে এসব খবর প্রচার করা হচ্ছে। প্রতি জেলায় মাঝে মাঝে মোবাইল কোট বসিয়ে ইভটিজিংকারীদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে। রোগ করছে ছয় থেকে এক বছরের জেল-জরিমানা। আবার অনেক অপরাধকারী  রাজনৈতিকভাবে প্রভাবে খাটিয়ে মুক্তি পাচ্ছে।
এভাবে অনেক নারীর জীবন শেষ হচ্ছে। কিন্তু ইভটিজিং কি বন্ধ হচ্ছে? বন্ধ হচ্ছে না। তবে সরকারিভাবে যদি ইভটিজিং কারীকে দৃষ্টান্তমূলক ও লজ্জাজনকভাবে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা হতো, তবেই সমাজ জীবন থেকে এ ব্যাধি চিরদিনের জন্য বিদায় নিত। একজনের কঠোর শাস্তি দেখে অন্য ১০ জন এমনি ইভটিজিং ছেড়ে ভালো পথে চলার চেষ্টা করত।
ইসলাম ধর্মে পর্দা পালন করা ফরজ। বর্তমানে নারী সমাজ পর্দা লঙ্ঘন করার কারণে ইভটিজিং নামক মরণব্যাধির স্বীকার হচ্ছে। ইসলামের পূর্বে অর্থাৎ জাহেলি যুগে নারীদের পারিবারিক ও সামাজিকভাবে কোনো প্রকার মূল্য বা সম্মান ছিল না। ইসলাম আবির্ভাবের পর থেকে ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী নারীদের যথাযথ মর্যাদা ও মূল্য দেয়া হচ্ছে। বিশ্বনবী (সা.) নারীকে জীবন্ত কবর দেয়া থেকে রক্ষা করেছেন। সম্পত্তিতে মেয়ের অধিকার, বিবাহে মোহর প্রদানসহ অসংখ্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ‘বিশ্বনবী (সা.) তাদেরকে তাদের প্রাপ্য অধিকার প্রদান এবং সম্পত্তি ও মীরাসে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’ তিনি (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’ যেনা-ব্যভিচার এবং সামাজিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত থাকার জন্য আল্লাহ বলেন, ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ কাজ।’ বিশ্বনবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা অপব্যয় করো না, চুরি করো না এবং ভ্যবিচার করো না।’  ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম। ইসলাম বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে না। তাই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য, পুরুষের দৃষ্টি বা কু-মন্ত্রণা থেকে রক্ষার জন্য ইসলাম পর্দা বা হিজাবের ব্যবস্থা করেছে। পর্দার ব্যাপারে কোরআন মজিদে এরশাদ হচ্ছে, ‘হে নবী! আপনার স্ত্রীদেরকে .কন্যাগন এবং মুমিন মহিলাদের বলে দিন, তারা যেন নিজেদের চাদরের কিয়দাংশ নিজের (বুকের) ওপর ঝুলিযে রাখে। এতে তাদের (সম্ভ্রান্ত হিসেবে) চিনতে সহজ হবে। ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল ও দয়াল।’ (সূরা : আহযাব) ইসলামের নিতীমালা হচ্ছে, পুরুষ নিজের দৃষ্টিশক্তিকে সংরক্ষণ করবে, আর নারীরা নিজের রূপ বা সৌন্দর্য গোপন রাখবে। নারী-পুরুষ যখন ইসলামের নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে চলবে তখন ইভটিজিং নামক জঘন্যতম ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা মোটেও থাকবে না। কেননা, মহান আল্লাহ তাআলা নারীদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের ব্যাপারে কঠিন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘তারা (নারী) যেন প্রকাশমান (অঙ্গ) ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে এবং তাদের মাথার ওড়না বক্ষাদেশে ফেরে রাখে’ (নুর)।
পর্দা করা শুধু নারীর ওপর ফরজ নয়, পুরুষের ওপর ফরজ। বিশ্বনবী (সা.) পুরুষের দৃষ্টিশক্তি নারীর ওপর নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন। এই বিধানটি যদি সমাজ জীবনে সত্যিকার ভাবে বাস্তবায়ন হতো তাহলে ইভটিজিং নামক মরণব্যাধি থেকে নারীরা রক্ষা পেত। সমাজ জীবনে প্রশান্তির ঝর্ণা ধারা প্রবাহিত হতো। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি বিশ্বনবী (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলাম যে, হঠাৎ করে যদি কোনো নারী বা মহিলার প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে যায়, তাহলে আমাকে কি করতে হবে? বিশ্বনবী (সা.) বললেন, তুমি তোমার দৃষ্টিশক্তি বিলম্ব না করে ফিরিয়ে নেবে।’ (মুসলিম)। তাছাড়া নারীদের দেখলে বলতে হয়, ‘হে আল্লাহ তুমি আমাকে শয়তানের ধোঁকা থেকে মুক্তি দাও।’
বর্তমানে নারীদের প্রতি ইভটিজিং নামক মরণব্যাধিটি সংঘটিত হওয়ার মূল কারণ হলো নারীরা কোনো ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে  চলাফেরা করেন না। ইসলামের বিধান হচ্ছে, মহিলারা সর্বদা ঢিলাঢালা পোশাক পরিধান করবে। মহিলাদের আর্কষণীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখবে। কেননা লজ্জা ও শালীনতা নারীদের ভূষণ। কিন্তু বর্তমান যুগ আধুনিক যুগ। আধুনিকতার স্রোতে নারীরা ঢিলাঢালা কাপড়ের পরিবর্তে স্কিনটাইট প্যান্ট শাট, কাটা হাতা জামা পরছে ও শর্ট পোশাক পরিধান করে চলেছে। এসব শটকাট পোশাক-আশাক পরিধানের কারণে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ  দেখা যাচ্ছে। অথচ ইসলাম ধর্ম নারীদের জন্য এ ধরনের পোশাক পরিধান করা হারাম ঘোষণা করেছে। বেহায়াপনা, বস্ত্রহীন এবং বেমানান পোশাক নারীদের শরীরে একেবারে বেমানান। তাই নারীদের সর্বদা ঢিলাঢালা পোশাক পরিধান করা উচিত। বিশ্ব নবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর অভিশাপ ঐ সকল নারীর ওপর, যারা কাপড় পরেও উলঙ্গ থাকে।’ বিশ্বনবী (সা.) কি সুন্দর কথা বলেছেন। ইসলামী বিধান ও পর্দা প্রথার মাধ্যমে ইভটিজিংসহ নারীর সকল প্রকার মঙ্গল রক্ষা করা সম্ভব।
সর্বশেষে আমি বলতে চাই, ইভটিজিং একটি মরণব্যাধি। এ মরণব্যাধী থেকে আমরা মুক্তি পেতে চাই। তাই সমাজ জীবনে প্রত্যেক নারীর ওপর পর্দা করা ফরজ। লজ্জা ও শালীনতা বজায় রাখা দরকার। সমাজের সন্ত্রাসী বা বখাটেদের আইন-শাসন প্রয়োগ করে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার দরকার রয়েছে। প্রত্যেক সমাজে নারী ও মা-বোনদের ইভটিজিং থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনে প্রত্যেক অভিভাবককে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি পুলিশ বা প্রশাসনকে  সার্বিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িযে দিতে হবে। শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশাসনকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তবেই সমাজ জীবন থেকে ইভটিজিং নামক মরণব্যাধি দূর করা সম্ভব হবে। এই হোক প্রতিটি মুসলিম জীবনের কামনা।

আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print