শুক্রবার , ২৭ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » ২০১৪ এর মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’

২০১৪ এর মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’

KL-1419987775দেশে মানবাধিকার-পরিস্থিতি ভয়াবহ উল্লেখ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেছেন, ‘২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে মানবাধিকার-পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা মোটেই সন্তোষজনক নয়।’

মানবাধিকার-পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশে খুন, গুম বন্ধ হয়নি। ক্রসফায়ারের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ। বড় দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনের পর অপহরণ করে খুনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইন পাসের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তল্লাশির নামে বিভিন্ন গণমাধ্যম অফিসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢুকে গণমাধ্যমকর্মীদের হয়রানি করার ঘটনাও ঘটেছে।’

বুধবার বেলা ১১টায় সেগুনবাগিচায় সাগর-রুনি মিলনায়তনে আইন ও সালিশ কেন্দ্র আয়োজিত ২০১৪ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশকালে সুলতানা কামাল এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি লিখিত বক্তব্য ও মানবাধিকার-পরিস্থিতির বিস্তারিত পরিসংখ্যান আকারে তুলে ধরেন।

পরিসংখ্যানের শুরুতেই ক্রসফায়ার নিয়ে কথা বলেন সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক বা গ্রেফতার হওয়ার আগে-পরে ক্রসফায়ার ও বিভিন্ন নির্যাতনে নিহতের সংখ্যা ১৫৪ জন, যার সংখ্যা ২০১৩ সালে ছিল মাত্র ৭২ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক অপহরণের সংখ্যা মোট ৮৮ জন। এর মধ্যে ২৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ১২ জনকে, মিডিয়ার সামনে হাজির করানো হয়েছে আটজনকে, কারাগারে পাওয়া যায় দুজনকে এবং গ্রেফতার দেখানো হয় একজনকে। এদের সবাই সরকারি দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী।

২০১৪ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নানাভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। এর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ৭৬১, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হাঙ্গামা ১৯৩টি, মন্দিরে আক্রমণ ২৪৭টি, ধর্ষণ দুটি, শ্লীলতাহানি চারটি, নিহত একজন ও আহত হয়েছেন মোট ২৫৫ জন নারী ও পুরুষ।

২০১৪ সালে রাজনৈতিক সংঘাতে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা প্রাণ হারান মোট ১৪৭ জন। এদের মধ্যে অধিকাংশ প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৬৬৪টির মতো ঘটনায় মোট আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৩৭৩ জনের মতো।

২০১৪ সালে সাংবাদিকদের ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খড়্গ চালিয়েছিল। তাদের দ্বারা ২৩৯ জনের মতো সাংবাদিক বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে নির্যাতনে মৃত্যু, খুন ও নিখোঁজের সংখ্যা ছিল চারজন। এ ছাড়া ২০১৪ সালে সীমান্ত সংঘাতের ফলে মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। এ বছর গুলিতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৬ জন। ঘটেছে কারা-হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা। এ বছর দেশের বিভিন্ন জেলায় কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬০ জন। তাদের মধ্যে ৩১ জন হাজতি ও ২৯ জন কয়েদি ছিল। তা ছাড়া সারা দেশে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ছিল মোট ১২৭ জনের মতো।’

সুলতানা কামাল বলেন, ‘২০১৪ সালে অ্যাসিড নিক্ষেপ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ছিল চোখে পড়ার মতো, যা মোটেই কাম্য নয়। এ বছর অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে মোট ৪৮টির মতো। এর মধ্যে দুজন মারা গেলেও মামলা হয়েছে মোট ১৩টির মতো। আর যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে মোট ২৪১টির মতো। যাদের অনেকেই আত্মহত্যা করেছেন, আহত হয়েছেন কিংবা খুনের মতো ঘটনা ঘটেছে।

সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল এ বছর গৃহপরিচারিকা নির্যাতন। এই নির্যাতনে এ বছর ২৯ জন মারা গেছেন। সালিশ ও ফতোয়ার মাধ্যমে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। যৌতুক-নির্যাতন হয়েছে মোট ১৩৯টির মতো। এ ছাড়া পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে মোট ২৬১টি। এ বছর সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক ছিল ধর্ষণের ঘটনা। এর সংখ্যা ছিল ৭০৭টির মতো। এর মধ্যে ধর্ষণের চেষ্টা ৮১, একক ধর্ষণ ৩৮৭, গণধর্ষণ ২০৮ ও অন্যান্য মিলে ৩১টির মতো।

সবশেষে সুলতানা কামাল বলেন, ‘মানবাধিকার-পরিস্থিতির অবনতি যেভাবে হয়েছে, তার সবকিছু এখানে উল্লেখ করা হয়নি, সারসংক্ষেপ উল্লেখ করা হয়েছে। সবকিছু উল্লেখ করলে সারা দিন লেগে যেত। তবে এর ওপর প্রতিবছর একটি করে বই বের করা হয়ে থাকে। সব মিলে মানবাধিকার-পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। আশা করি, আগামী বছর মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে নাগরিক সমাজ আরো বেশি সোচ্চার হবে, যেন আমরা যাতে আরো বেশি সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে পারি।’

 

 

 

#


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print