সোমবার , ২৩ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » খেলাধুলা » তিস্তা চুক্তি কি শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

তিস্তা চুক্তি কি শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

 

download (2)শামীম হোসেন :
প্র্রতিবেশি ও বন্ধু প্র্রতিম দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর মধ্যে তিস্তার পানিবন্টন সংক্রান্ত চুক্তিটি কয়েক যুগ ধরে কেবল ঢাকা-দিল্লির আলোচনার টেবিলেই বন্দী রয়েছে। বাধ্যবাধকতা না থাকায় শুস্ক মৌসুমেও ভারতের বাঁধে আটকা পড়ে এক সময়ের খরস্রতা এই নদীর পানি প্র্রবাহ। ফলে দেশের অন্যতম বড় তিস্তা সেচ প্র্রকল্প অকেজো হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পানির প্রবাহ নিয়মিত না হওয়ায় এখানকার পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই সমস্যা সমাধানে জোর চেষ্টা চালালেও কোনো সুফল আসেনি। এমনকি দেশের পত্র-পত্রিকা কিংবা বুদ্ধিজীবীদের কলমেও দেখা যাচ্ছে না এ নিয়ে কোনো লেখা। ফলে এই ইস্যুটি আড়ালে চলে গেছে।

এখন শুস্ক মৌসুম শুরু হয়েছে, কমে গেছে তিস্তার প্রবাহ। তাই ইস্যুটি আবারো গণমাধ্যমের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এ নিয়ে কথা বলার হয়ত একটা সুযোগ হয়ে উঠবে। তবে এই অঞ্চলের বাসিন্দারা মনে করেন, এই চুক্তি যত দ্রুত কার্যকর হবে ভুক্তভোগিদের জন্য ততোই মঙ্গলজনক। তারা জানতে চান এই চুক্তি কি শুধু আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

বিজ্ঞানের এই যুগেও বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ এখনো কৃষি প্রধান দেশ হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলাদেশের চাষাবাদের ক্ষেত্রে সেচের ভূমিকা অপরিসীম। আর বাংলাদেশ নদী ভিত্তিক সেচ প্রকল্পের ক্ষেত্রে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প একটি মাইলফলক। তিস্তা নদীর পানি প্রধানত সেচকাজে ব্যবহারের জন্য ১৯৮৩ সালে ভারত জলপাইগুড়িতে গজলডোবায় এবং বাংলাদেশ লালমনিরহাটে দোয়ানিতে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করে। কিন্তু তিস্তায় পানি প্রবাহ ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়ায় এই প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ। ভারত শুস্ক মৌসুমের আগেই ব্যারেজ ও সেচখালের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেয়ায় কারণে বাংলাদেশের ব্যারেজটি এই মৌসুমে অকার্যকর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে এই পানি ভারত পুরোপুরি ছেড়ে দেয়ায় ফলে বাংলাদেশে বন্যা ও নদীভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়। আর এ কারণেই উত্তরাঞ্চের মানুষের ভাগ্যবদল হচ্ছে না। তাই এই অঞ্চলের মানুষের দিনবদলে তিস্তার পানি প্রাপ্তি নির্ধারণের কোনো বিকল্প নেই।

১৯৭২ সালে আন্তঃসীমান্ত নদী সমূহের উন্নয়নের দিককে সামনে রেখে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে তিস্তা বিষয়ে আলোচনা হয়ে আসছে। এই সময়ের সাফল্য ছিল, ১৯৮৩ সালে যৌথ নদী কমিশনের ২৫ তম বৈঠকে তিস্তার প্রানি বন্টনের জন্য বাংলাদেশ ও ভারত একটি এডহক চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল। এই চুক্তিতে বলা হয়েছিল তিস্তার প্রবাহের জন্য ২৫ শতাংশ পানি রেখে বাকি ৭৫ শতাংশ পানি ভারত ও বাংলাদেশে মধ্যে (৩৯:৩৬) অনুপাতে ভাগ করা হবে। কিন্তু এই পানি কোথায় এবং কোন প্রদ্ধতিতে বন্টন হবে সে বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় চুক্তিটি আলোর মুখ দেখেনি। এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তিস্তা বিষয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক হলেও দুই দেশ তিস্তার বিষয়ে একমত হতে পারেনি।

তিস্তার পানিতে টান পড়েছে। দিন দিন আরো কমে যাবে নদীর পানি। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ এলাকার কৃষক। কারণ কৃষি জমিতে সেচ দেয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে এই তিস্তা। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শুস্ক মৌসুম শুরু হয়েছে। আগামী বর্ষার আগে তিস্তায় পানি আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। বাংলাদেশিদের সমস্যা হলেতো ভারতকে দেখতে হবে। যেহেতু আমরা পাশাপাশি রাষ্ট্র। ভারত সরকার পানি না দিলে সেচ হবে না। আর আমরা জেলেরা যারা মাছ শিকার করি পানি না থাকলেতো আর মাছ পাওয়া যাবে না।

মাছ হবেই বা কি করে মৃতঃপ্রায় এই নদীতো নিজেই বাঁচতে পারছে না। নদীটির বেঁচে থাকতে যতটুকু পানির প্র্রবাহ দরকার গত এক যুগ ধরে সেই প্র্রবাহটুকুও আসছে না উজান থেকে। ফলে তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্র্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল উত্তরের কৃষি ধীরে ধীরে বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানকার কৃষকরা বলেছেন, ভারত পানি দিলে চাষ হবে আর না দিলে চাষ হবে না। যদি পানি দেয় তাহলে আমাদের ব্যারেজও বাঁচবে এবং নদীও বাঁচবে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবন হয়ে উঠবে কর্মচঞ্চল।

ভারতের সঙ্গে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তিসহ স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকরের ব্যাপারে ভারতের পক্ষ থেকে একাধিক বার আশ্বাস দেয়া হলেও বিভিন্ন কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উদ্যোগী হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন। তখন আশা করা হয়েছিলো যে, এই চুক্তি বাস্তবায়নের পথ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তবে সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়। এরপর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রীর মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করেন। তখন আমরা আশাবাদী ছিলাম যে এবার হয়তো তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হবে। কিন্তু মমতার জোরালো বিরোধিতার কারণে এই চুক্তি আটকে যায়। পরে অবশ্য ভারতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয় তিস্তার পানির ৭৫ শতাংশ ভারত নেবে ২৫ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে। এটি মেনে নেয়া বাংলাদেশের পক্ষে অবশ্যই যৌক্তিক ছিল না।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ধারণা করা হয়েছিল বাংলাদেশের জন্য ভারত এবার অনুকূলেই থাকবে। কিন্তু তিনিও তার পুর্ব পুরুষদের পথেই হাঁটছেন। তবে চিস্তা ও স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকরের ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে নতুন আশ্বাস পাওয়া গেছে। সম্প্রতি নেপালের রাজধানী কাঠমন্ডুতে অনুষ্ঠিত অষ্টাদশ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর প্রররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ঝুলে থাকা দু’টি বিষয়ের সমাধানে তিনি জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এ বিষয় ভারতে ঐক্যমত তৈরি হচ্ছে, উল্লেখ করে এ ইস্যুগুলোর সমাধানে তিনি তার জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি স্থল সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে অচিরেই একটি রিপোর্ট পেশ করা হবে এবং এটি গৃহীত হবে। তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়টির সমাধানেও আলোচনা চলছে।

তিস্তা নদীর দু’পাশের মানুষদের বাঁচাতে হলে প্রথমেই বাঁচাতে হবে এই নদীটিকে। আর তিস্তা নদীকে বাঁচাতে হলে এর পানির প্র্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য এই নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে শুধু আলোচনা নয়, ভারতের সঙ্গে একসঙ্গে বসে এই নদীর অববাহিকা ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তানা হলে ভবিষ্যতে তিস্তা নদীকে আর বাঁচানোই যাবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও নাট্যকর্মী


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print