বুধবার , ২৫ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » সুন্দরবনে মারা পড়ছে প্রাণী, সংকটে প্রাণবৈচিত্র্য

সুন্দরবনে মারা পড়ছে প্রাণী, সংকটে প্রাণবৈচিত্র্য

crab-in-mudসুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলের ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েলের কারণে পরিবেশে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মরতে শুরু করেছে ছোট ছোট মাছ, কাঁকড়া, গুইসাপসহ জলজ প্রাণী।

চট্টগ্রাম থেকে তেল অপসারণের জন্য আসা কাণ্ডারি-১০ টাগবোটের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাতিল করা হয়েছে বন ও পরিবেশ বিভাগের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি।

শ্যালা নদীর ট্যাংকার ডুবির আশেপাশে বনের মধ্যে গাছে, শ্বাসমূল ও ঠেসমূল, পাতা-কাণ্ডে তেল লেপ্টে কালো হয়ে আছে। তেলের আস্তরণ হালকা হয়ে গেলেও পানি ব্যবহার করতে পারছে না নদীর তীরের মানুষে।

তেল ভেসে গিয়ে খাল-নালায় গাছে-লতাগুল্ম-শাসমূল-ঠৈসমূলে আটকে গেছে। ভাসমান শেওলা তেলের রঙে কালো হয়ে গেছে। ফলে শ্বসন বন্ধ হয়ে এসব উদ্ভিদ মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদী সংযোগকারী খালগুলো বেয়ে তেল চলে গেছে বনের মধ্যে। শুক্রবার থেকে আর চোখে পড়ছে না শুশুক (ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিন)। এর আগেই ছোট ছোট মাছ মারা যাওয়া শুরু করেছে।

খালপাড়ের পলিমাটির রঙ বদলে কালো চেহারা নিয়েছে। ভূমি থেকে তা পাঁচ থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত হবে কালো হয়ে গেছে গাছের গোড়ালি। ঘটনার পর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেউ কেউ তেল সংগ্রহ করছিল। বনবিভাগের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে উদ্বুব্ধ করা হয়। পরে সরকারিভাবে ঘোষণা আসায় পরিকল্পিতভাবে তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে।

গত ৯ ডিসেম্বর ভোরে বিপরীত দিক থেকে আসা খালি ট্যাংকারের ধাক্কায় ডুবে যায় ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস ওয়েল বহনকারী ওটি সাউদার্ন স্টার ৭ নামের তেলবাহী ট্যাংকার। এ তেল গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের জন্যে নিয়ে আসা হচ্ছিল। ঘটনার পরে চালক (মাস্টার) মোখলেসুর রহমান নিখোঁজ হন। গত ১১ ডিসেম্বর বেলা ১১টার দিকে ডুবে যাওয়া ট্যাংকারটি সরিয়ে চাঁদপাই ফরেস্ট অফিসের জেটির কাছে রাখা হয়েছে।

সিদ্দিকুর রহমান নামে এক জেলে বলেন, ‘আমি সুন্দরবনে মাছ ধরতাম। এখন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার তেল কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয়ায় আমরা ২৫ জনের একটি দল নৌকা নিয়ে বনের মধ্যে থেকে তেল সংগ্রহ করেছি। আমি একাই দুই ড্রাম তেল সংগ্রহ করেছি।’

চালুনি, মগ, কুলা দিয়ে তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে উল্লেখ করে সিদ্দিকুর আরো বলেন, ’নদীতে জাল ফেলার কোনো সুযোগ নেই। জাল ফেললেই তাতে তেল আটকে যাচ্ছে। একারণে জাল দিয়েও কেউ কেউ তেল আটকে তা তোলার চেষ্টা করছে। এই তেল নদী-খালের ভাসমান পানি থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। গাছে-পাতা-শ্বাসমূলে যা আটকে আছে, তা অপসারণ করা যাচ্ছে না।’

জয়মনির বাসিন্দা বিল্লাল মৃধা গত ৪০ বছর ধরে সুন্দরবনের খাল-নালায় মাছ ও কাঁকড়া ধরেন। ঘটনার রাতে দুর্ঘটনাস্থলের অদূরে বটতলা খালে তিনি কাঁকড়া ধরছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ’ভোর রাতে (৯ ডিসেম্বর) চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনি। দিনের আলো বেরুলে বড় নদীতে (শ্যালা) এসে দেখি জাহাজ ডুবে গেছে। আর গল গল করে তেল বেরুচ্ছে। আমি আরও একদিন বনের মধ্যে ছিলাম, কিন্ত কাঁকড়া আর পাইনি; তখন জাল ও দড়িতে তেল লেগে একাকার হয়ে যায়। আমি ফিরে আসি।’ তিনি আরও বলেন, ’চিংড়ির পোনা আর বেঁচে নেই। এগুলো নদীর উপরে ভেসে থাকে। ছোট মাছও মরেছে। কিছু সাপও মরেছে। দেখা যাচ্ছে না শুশুক।’

চাঁদপাই ফরেস্ট অফিসের সহকারী স্টেশন কর্মকর্তা মো. আলমগীর পাঠান বাংলামেইলকে জানান, তাদের এই স্টেশনের আওতায় এক হাজারেরও বেশি নৌকার বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) আছে; যারা বনে যেতে পারে। এদের মধ্যে গড়ে পাঁচশো থেকে ছয়শো নৌকা প্রতি সপ্তাহে অনুমতি নিয়ে বনে যায়। এখন কাঁকড়া মওসুম। প্রধানত: কাঁকড়া আর মাছ ধরার জন্যে এসব অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু গত তিন দিন (বুধ, বৃহষ্পতি এবং শুক্রবার) বনে যাওয়ার জন্যে কেউই পাশ (অনুমতি পত্র) নিতে আসেননি।’

এদিকে, শ্যালা নদীতে ডুবে যাওয়া ট্যাংকার থেকে নিঃসৃত তেল অপসারণে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ওয়েল স্পিলড ডিসপারেসেন্ট নামের রাসায়নিক পদার্থ ছিটানো শুরু করা হলেও পরে স্থগিত করে কাণ্ডারি-১০ টাগবোট। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় বন বিভাগ আপত্তি করায় কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

এ ব্যাপারে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের কর্মকর্তা আমীর হোসেইন চৌধুরী বাংলামেইলকে বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর ওয়েল স্পিলড ডিসপারেসেন্টের মান পরীক্ষা করে দেখছে। ফলাফল ইতিবাচক হলে প্রয়োগ করার ব্যাপারে আমাদের আপত্তি থাকবে না।’

আমীর হোসেইন আরো বলেন, শ্যালা নদী ডলফিনের অভয়ারণ্য। এখানে ছয় প্রকারের ডলফিন বিচরণ করে। রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে আর একটি বিপর্যয় ঘটবে, যা আমরা করতে দিতে পারি না। তেল অপসারণে রাসায়নিক পদার্থ ছিটানো স্থগিত রেখেছে কান্ডারি ১০। বর্তমানে এটাটি চাঁদপাই ফরেস্ট অফিসের কাছে নোঙর করে রাখা হয়েছে।

এদিকে, খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জহির উদ্দিন আহমেদ জানান,  এ অঞ্চলের বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ নির্দেশ বলবৎ থাকবে।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print