বৃহস্পতিবার , ১৯ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » সুন্দরবনের ৭০ কিমি জুড়ে তেলের স্তর, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশংকা

সুন্দরবনের ৭০ কিমি জুড়ে তেলের স্তর, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশংকা

সুন্দরবনের  ৭০ কিমি জুড়ে তেলের স্তরসুন্দরবনের মধ্যে ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কার থেকে প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়েছে সুন্দরবন এলাকার নদী-খালসহ ৭০ কিলোমিটার এলাকায়। জোয়ারের সঙ্গে এই তেল চলে এসেছে খুলনা নগরীসংলগ্ন রূপসা নদীতেও। এভাবে তেল ছড়িয়ে পড়ায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। এখনো পর্যন্ত তেল অপসারণের কোনো ব্যবস্থাই করতে পারেনি সরকারি সংস্থাগুলো। উদ্ধার হয়নি ট্যাঙ্কারটি। বুধবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে ট্যাঙ্কার ডুবে যাওয়া অংশে তেল ছড়িয়ে পড়া অব্যাহত থাকতে দেখা গেছে। ঘন কালো ঊর্ধ্বমুখী ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় তেল। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সন্ধান মেলেনি নিখোঁজ ট্যাঙ্কারচালক মোখলেসুর রহমানেরও। এরই মধ্যে সুন্দরবন এলাকার কয়েকটি স্থানে নদীতে মরা মাছ ভাসতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দীর্ঘ মেয়াদে এ অঞ্চলের বেশির ভাগ উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণী অক্সিজেন ও খাদ্যসংকটে পড়ে মৃত্যুর মুখে পড়বে। এ সময়টি মাছ, ডলফিন প্রভৃতির প্রজননের সময় হওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ হবে আরও বেশি। অধিকাংশ জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যাবে। বন বিভাগ ১০০ কোটি টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করে মংলা থানায় মামলা করেছে।

এদিকে, সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকার নদীতে তেল ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও সুন্দবন রক্ষা জাতীয় কমিটি। বুধবার সংগঠন দুটির যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ট্যাঙ্কারডুবির পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা তো নয়ই, এমনকি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে তেল ছড়িয়ে পড়া রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষ মানেনি। বাপার সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে অবিলম্বে সুন্দরবনকে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা এবং সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবি জানানো হয়।

ঢাকায় গতকাল নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারের জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যয়, বরিশাল থেকে নির্ভীক এবং চট্টগ্রাম থেকে টাগবোট কাণ্ডারি-১০ বাগেরহাটের পথে রওনা হয়েছে। ঘন কুয়াশার কারণে জাহাজগুলোর পেঁৗছাতে বিলম্ব হচ্ছে। কাণ্ডারি-১০ থেকে পানিতে রাসায়নিকের গুঁড়ো ছিটানো হবে, যেন ভেসে থাকা তেল পানির নিচে চলে যায়। তেল পানির নিচে চলে গেলে ওপরের পানির অক্সিজেন নষ্ট হবে না। তিনি জানান, ঘটনা তদন্তে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বন বিভাগ অসংখ্যবার আপত্তি জানানো সত্ত্বেও বছরের পর বছর সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে এই নৌরুটে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করছে। বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রভাবশালীদের প্রভাবেই এ অবৈধ নৌরুট দিয়ে এভাবে নৌযান চলাচল করছে।

তেলের কালো রঙে বদলে গেছে নদীর পানি :মংলার জয়মণিরগোল এলাকা থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় ট্রলারে করে মৃগমারী এলাকা পর্যন্ত যাওয়ার পথে শ্যালা নদীতে ভাসতে দেখা গেছে শুধু তেল আর তেল। ভাটার সময় এই তেলে নদীর চরের ওপরও গাঢ় কালো আবরণ দেখা যায়। সুন্দরবনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায়, গাছের নিচের অংশ আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে। এখানকার বাতাসেও এখন তেলের উৎকট গন্ধ। নদী তেলে ভেসে যাওয়ায় বুধবার এ এলাকায় কোনো মাছ ধরার নৌকা কিংবা কোনো জেলেকে নদীতে জাল ফেলতেও দেখা যায়নি।সকাল সাড়ে ৯টায় মৃগমারী এলাকায় পেঁৗছে দেখা যায়, ডুবে যাওয়ার ট্যাঙ্কারটির মালিকপক্ষ ওই ট্যাঙ্কারের সঙ্গে আরও দুটি ট্যাঙ্কার বেঁধে রেখেছেন। স্থানীয় কয়েকজন ডুবুরি থাকলেও তারা পানিতে নামেননি। ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে তখনও তেল বের হয়ে কালো হয়ে যাচ্ছে নদীর পানি। সকাল ১০টার দিকে জোয়ারে তেল ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায়।

জয়মণি এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন ২০ বছর ধরে। তিনি সমকালকে জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে আশপাশের নদী ও খালগুলোতে তেল ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এর পর থেকে জেলেরা আর নদীতে জাল ফেলতে পারছেন না। জাল ফেললে তাতে আলকাতরার মতো ঘন তেল জড়িয়ে জাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই এলাকার জেলে বৃদ্ধ আকরাম হোসেন ও আবদুল খালেক বলেন, সুন্দরবনে এমন ঘটনা তারা এর আগে দেখেননি। যেভাবে তেল ছড়িয়েছে, তাতে অনেক মাছ মারা যাবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। তারা বলেন, কত দিন যে মাছ ধরতে পারবেন না, তা বুঝতে পারছেন না। ওই এলাকার সোলায়মান সানা বলেন, তিনি হাঁস পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। মঙ্গলবার তেলমিশ্রিত পানি খেয়ে তার খামারের পাঁচটি হাঁস মারা গেছে। জয়মণিরগোল এলাকার জেলে আরিফুর রহমান দাবি করেন, বুধবার দুপুরে তিনি নদীতে কয়েকটি মরা মাছ ভাসতে দেখেছেন। গৃহবধূ আমেনা বেগম, জরিনা ও সালেহা বলেন, তারা খালের পানি গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন। তেলের কারণে পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। ওই পানি আর তারা ব্যবহার করতে পারছেন না।খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক কার্তিক চন্দ্র সরকার, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আমির হোসাইন চৌধুরীসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে যান।এদিকে, দু’দিন ধরে বিস্তীর্ণ এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়লেও তা অপসারণে কোনো ব্যবস্থাই নিতে দেখা যায়নি বন বিভাগ, কোস্টগার্ড বা সরকারি কোনো সংস্থাকে।এ ব্যাপারে বন সংরক্ষক কার্তিক চন্দ্র বলেন, কীভাবে ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়, সে বিষয়ে তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কাজ করবেন। তবে আপাতত তেল অপসারণের কোনো ব্যবস্থাই তারা করতে পারছেন না বলে স্বীকার করেন।

সুন্দরবনের  ৭০ কিমি জুড়ে তেলের স্তর dinkhon

কার্তিক চন্দ্র আরও জানান, তেল ছড়িয়ে পড়ায় বনসহ গোটা পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটেছে। যে এলাকায় ট্যাঙ্কারটি ডুবে গেছে, সেটি ডলফিনের অভয়ারণ্য। এতে ডলফিন, কুমিরসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও গাছপালার ক্ষতি হয়েছে।ডিএফও আমির হোসাইন চৌধুরী জানান, ফার্নেস তেলের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের তিনটি অভয়ারণ্যের ডলফিন, মাছ, কাঁকড়া ও জলজ প্রাণী। এ ছাড়া গাছপালা ও বন্য প্রাণীর ওপরও পড়ছে তেলের ক্ষতিকর প্রভাব। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য নিয়ে তারাও এখন উৎকণ্ঠায়। তিনি জানান, ঘটনাস্থলের উভয় পাশে কমপক্ষে ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই তেল ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা :খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ফার্নেস অয়েল যে কোনো জ্বালানি তেলের চেয়ে ভারী। তেলের কারণে সুন্দরবনে দুই ধরনের প্রজাতির প্রভাব পড়বে। প্রথমত, তেলের স্তরের কারণে সূর্যের আলো পানিতে প্রবেশ করতে পারে না। এতে নদীতে থাকা মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর অক্সিজেন সংকট তৈরি হয়। তারা খাদ্য তৈরি করতে পারে না। তিনি বলেন, এ সময়টা মাছের ডিম পাড়ার সময়। তেলের কারণে মাছের ডিম নষ্ট হয়ে যাবে। এ ছাড়া শ্যালা নদী ডলফিনের অভয়ারণ্য ও কুমিরের প্রজনন স্থান। জ্বালানি তেলের কারণে এদের শারীরিক সমস্যা হবে, এমনকি প্রজনন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. নাবিউল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, সুন্দরবনসহ ম্যানগ্রোভের বড় বৈশিষ্ট্য শ্বাসমূলের সাহায্যে অক্সিজেন গ্রহণ। তেলের স্তরের কারণে গাছের শ্বাসমূলের ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে অক্সিজেন সংকটে গাছগুলো একসময় মারা যাবে। তিনি বলেন, নিয়মিত জোয়ার-ভাটা ও দ্রুত তেল অপসারণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।উদ্ধার কার্যক্রম ও তদন্ত কমিটি :ট্যাঙ্কারডুবির একদিন পর বুধবার সকাল থেকে শুরু হয় হয় উদ্ধার কার্যক্রম। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ট্যাঙ্কারটির শুধু মাস্তুলের অংশ পানির ওপরে রয়েছে। সেই অংশের সঙ্গে দুটি জাহাজ বেঁধে রাখা হয়েছে। ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কার সাউদার্ন স্টার-৭-এর সুপারভাইজার মো. ওলিউল্লাহ জানান, তারা স্থানীয় ডুবুরিদের দিয়ে ট্যাঙ্কারটি উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তেলের কারণে স্থানীয় ডুবুরিরা নদীতে নামতে চাইছেন না। যাতে পুরোপুরি ডুবে না যায়, সে জন্য আপাতত দুটি নৌযান দু’দিক থেকে সাউদার্ন স্টার-৭কে আটকে রেখেছে।

দুর্ঘটনার কারণ এবং ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তার উপায় খুঁজতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও একজন পরিদর্শক রয়েছেন। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বন বিভাগ। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক বেলায়েত হোসেনকে। তিনি জানান, এরই মধ্যে তিনি তদন্তকাজ শুরু করেছেন। এ কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।এদিকে, নৌবাহিনীর জাহাজে ডুবুরি থাকলেও তেল সরানোর মতো আধুনিক সরঞ্জাম নেই বলে জানিয়েছেন খুলনা অঞ্চলের কমান্ডার মনির মলি্লক। তিনি বলেন, সনাতন পদ্ধতিতে বাঁশ ও কলাগাছ ব্যবহার করে পানির উপরিতলের তেল আলাদা করে তারা সরানোর চেষ্ট করছেন।

অবৈধ রুট, আগেও ডুবেছে নৌযান :সুন্দবনের ভেতর দিয়ে শ্যালা নদীর এ নৌরুট অবৈধ। বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এ রুট দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান না চালানোর জন্য গত তিন বছরে বহুবার সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ও বিআইডবি্লউটিএকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রভাবশালী মালিকরা গায়ের জোরে এ রুট ব্যবহার করে বিপজ্জনক নৌযান চালিয়েছেন। এ ব্যাপারে বেসরকারি সংস্থা সুন্দরবন একাডেমির উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম খোকন ও পরিচালক মো. ফারুক আহমেদ জানান, বন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করে তিন বছরের বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও পণ্যবাহী কার্গো চলাচল করছে। অবিলম্বে এই নৌরুটে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ করা জরুরি। এর আগে গত ২৪ নভেম্বর ভোরে এই শ্যালা নদীতেই ডুবে যায় নৌযান এমভি শাহীদূত। ঘন কুয়াশায় লঞ্চটি শ্যালা নদীর একটি ডুবোচরে আটকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে এর ডেকের তলা ছিদ্র হয়ে যায়। একপর্যায়ে ভেতরে পানি ঢুকে কাত হয়ে ডুবে যায় লঞ্চটি। ওই নৌযান এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print