রবিবার , ২২ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » স্বাস্থ্য » ভালো থাকুন ‘ত্রিফলা’ য়

ভালো থাকুন ‘ত্রিফলা’ য়

আমলকি, হরিতকি এবং বহেড়া এই তিনটি ফল একত্রে বলা হয় ত্রিফলা। দেখা যাক তিনটি ফলের কি কি ঔষধি গুণাগুণ আছে যার কারণে ভেষজবিদেরা তিনটি ফলকে একসঙ্গে খাওয়ার triphalaপরামর্শ দিয়েছেন।
আমলকীঃ আমলকীর প্রধান অন্তর্নিহিত গুণ হচ্ছে-বায়ু, পিত্ত এবং কফের যে কোনটির বা সবগুলির বিকৃতিকে স্বাভাবিক করে দেয়। এ ছাড়া শরীর রক্ষা করার জন্য এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে পরিচিত প্রধান উপাদান ভিটামিন সি আছে প্রচুর পরিমাণে যা অন্য কোন ফলে নেই। এর রস-
(ক) অকালবার্ধক্য প্রতিরোধ করে
(খ) পেট পরিস্কার রাখে
(গ) খাদ্য অরুচি থাকলে দুর করে
(ঘ) শরীরের কোষ মধ্যস্থ টক্সিন পদার্থ রূপান্তরিত করে অধিকতর সক্রিয় করে পুনরায় তরুন করে দেয়।
একক ফল হিসাবে আমলকীতে সর্বাধিক গুণ থাকায় এটি বিভিন্ন রোগ নিরামক হয়ে আসছে তার কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রঃ-
১। এসিডিটিঃ খাদ্যের কারণে একবার এসিডিটি হলে পিত্তবিকৃতি হয়ে হজম প্রক্রিয়ায় নানা রকম গোলযোগ দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে শুকনা আমলকি ৩-৪টি এক গ্লাস পানিতে পূর্বদিন রাতে ভিজিয়ে রেখে পরদিন দুপুরের খাওয়ার পর পানির পরিবর্তে এই পানি পান করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে আমলকি কোন ধাতুরপাত্রে ভেজান যাবে না। কাঁচের গ্লাসে ভেজান উত্তম।
২।  জ্বরঃ জ্বর কিছুতেই ছাড়তে চায় না। ১ চা চামচ আমলকীর রসে সামান্য ঘি মিশিয়ে খেয়ে এক গ্লাস/কাপ কুসুম গরম পানি পান করতে হবে। তিন ঘন্টা অন্তর অন্তর ৩ বার গ্রহণ করলে জ্বর উপশম হবে।
৩। প্রস্রাব বিকৃতিঃ প্রস্রাব সংক্রান্ত যে কোন রোগে আক্রান্ত এমনকি ডায়েবেটিস হলে ৩-৪ টি আমলকী কাঁচা অথবা শুকনা পানিতে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে সেই পানি দিনে ২-৩ বার পান করতে হবে।
৪। হিক্কায় ঃ আমলকীর রস ১ চা চামচ অথবা শুকনা আমলকীর ভেজান পানিতে ১/৪ চা চামচ মধু এবং ২ গ্রাম পিপুল পাউডার মিশিয়ে খাওয়ালে হিক্কা বন্ধ হয়।
৫। শ্বেত প্রদর (খবঁপড়ৎৎযড়বধ) ঃ যে কোন বয়সের মেয়েদের শ্বেত প্রদর
দেখা দিলে ছোট দুটো কাঁচা আমলকীর রস একটু চিনি অথবা মধুসহ খেতে হবে। কাঁচা রস না হলে শুকনা আমলকী পাউডার ১/৪ চা চামচ পরিমাণ চিনি অথবা মধু দিয়ে খেলেও কাজ হবে।
৬। যে কোন পিত্ত বিকৃতিতে/এসিডিটিঃ প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ৪ গ্রাম আমলকী পাউডার এবং ১ গ্রাম নিমপাতা পাউডার ১ কাপ পানিতে মিশিয়ে পান করলে কিছুদিনের মধ্যেই এই রোগ প্রশমিত হবে।
৭। বাচ্চাদের পেট ব্যথা ঃ আমলকী এবং থানকুনি পাতা সমপরিমাণ বেঁটে পেটে লাগালে পেট কামড়ানি কমে যায়। বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে খুবই উপকারী।
হরিতকী ঃ যে কোন ঔষধি দ্রব্য গ্রহণ করলে কোন না কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কিন্তু হরিতকী সেবনে কোন প্রকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না। তবে এর প্রধান বৈশিষ্ট হচ্ছে কোন প্রকার রাসায়নিক জটিলতা ছাড়া সর্বশরীরের বিভিন্ন রোগ উৎপাদক দুষিত মল নিষ্কাশন করিয়ে দেহকে দুষণমুক্ত রাখে। বিভিন্ন রোগ প্রতিকারে হরিতকীর ব্যবহারঃ-
১। অর্শ রোগ ঃ হরিতকী চূর্ণ (উপরের খোসা) ৩-৪ গ্রাম ঘরে পাতা ঘোলের সঙ্গে একটু সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে দিনে একবার খেলে উপশম হবে।
২। কোষ্ঠকাঠিন্য ঃ হরিতকী চুর্ণ ৫ গ্রাম এবং সামান্য সন্ধব লবণ মিশিয়ে ২ বার সকাল বিকাল খেলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
৩। রক্ত অর্শে ঃ হরিতকী চুর্ণ এবং আঁখের গুঁড় মিশিয়ে নিয়মিত দিনে একবার খেলে অল্প দিনের মধ্যেই এর ফল পাওয়া যায়।
৪। পিত্তশুলে/এসিডিটি ঃ অল্প ঘিয়ের সঙ্গে হরিতকী চুর্ণ ৩-৪  গ্রাম মিশিয়ে খেলে উপশম হয়।
৫। ফোলা রোগ/শোধে ঃ হরিতকীর চুর্ণ গুলঞ্চের রস একসঙ্গে মিশিয়ে খেলে যে কোন প্রকার ফোলা রোগে উপকার পাওয়া যায়।
বহেড়াঃ ত্রিফলার একটি অংশ হিসাবে বহেড়ার গুণাগুণ প্রায় আমলকী এবং হতিকীর কাছাকছি। প্রধান গুণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এটা মস্তিকের শক্তিবর্ধক, পাকস্থলীর বলকারক, ক্ষুধাবর্ধক, হজমকারক, রক্তপাত বন্ধকারক তাছাড়া অর্শ, শোধ, অজীর্ণ, উদারাময় এবং পাতলা পায়খানায় বিশেষ উপকার হয়।
উপরোক্ত গুণাবলির কারণে বিভিন্ন রোগ প্রতিকারে এর ঔষধী ব্যবহারঃ-
১। আমশয় ঃ সাদা অথবা রক্ত আমশয় যে কোন আমশয়ই বহেড়া চুর্ণ সকাল বিকাল ২-৩ গ্রাম মাত্রায় ১ কাপ পানিতে মিশিয়ে খেলে আমশয় সেরে যাবে। তবে পথ্য হিসাবে চিড়া ভেজানো মাঁড় খেলে তাড়াতাড়ি উপকার পাওয়া যাবে।
২। যৌন দুর্বলতায় ঃ এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন দুটি করে বহেড়া বীজের শাঁসের পাউডার এককাপ পানিতে ভিজিয়ে খেতে হবে। এতে ইন্দ্রিয় শক্তি ফিরে আসবে।
৩। পাতলা পায়খানা/ডায়রিয়া ঃ আমসহ পাতলা পায়খানা, শব্দ করে বায়ুসহ মল নির্গত হয়। এক্ষেত্রে বহেড়াচুর্ণ ১ গ্রাম ও ২৫০ মিলিগ্রাম মুথো (ভাদালিয়া) ঘাসের শিকড় এক সঙ্গে বেঁটে সকাল বিকাল ২ বার খেলে ২ দিনেই এর নিরাময় হয়।
৪। হাঁপানী ঃ হৃদযন্ত্রগত হাঁপানী ছাড়া অন্য যে কোন হাঁপানী হলে ২টা বহেড়া বীজের শাঁস পাউডার এককাপ পানিতে ভিজিয়ে খেতে হবে।
৫। কাঁশিতে ঃ বুকে সর্দি নেই। কাঁশি হচ্ছে অথচ কিছু বেরুচ্ছে না এ ক্ষেত্রে ঘিয়ে ভাজা বহেড়া চুর্ণ এবং ভাদালিয়া ঘাসের শিকঁড় মূলের গোটা এক সঙ্গে সকাল বিকাল খেলে এই কাঁশি বন্ধ হবে।
৬। শ্লেষ্মায় ঃ ঋতু বদলের সময় ঠান্ডা লেগে কাঁশি হয়। ঋতু বদলের সময় বহেড়া চুর্ণ ঘিয়ে একটু গরম করে ২-৩ গ্রাম মাত্রায় মধু মিশিয়ে চেটে খেলে ঠান্ডা লাগলে সারবে এবং ঠান্ডা না লাগলে এর থেকে রক্ষা করবে।
৭। স্বরভঙ্গে ঃ উচ্চস্বরে ভাষণ দেওয়ার কারণে অথবা হঠাৎ একসঙ্গে ঠান্ডা গরম খাওয়ার কারণে স্বর বসে গেলে ২-৩ গ্রাম বহেড়া চুর্ণ মধু মিশিয়ে চেটে খেলে স্বর স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
৮। টাঁক ঃ অল্প বয়সে চুল পড়ে যাচ্ছে। বহেড়া বীজ মিঁহি করে বেটে একদিন পর একদিন চুলে লাগালে নতুন চুল গজাবে এবং চুলগুলি শক্ত হবে। এছাড়া যাদের চুল অকালে পেঁকে যাচ্ছে তারা বহেড়ার বীজ ১০ গ্রাম বেটে এক কাপ পানিতে গুলে মাথায় লাগাতে হবে। ২০-৩০ মিনিট রেখে চুল ধুয়ে নিতে হবে।

আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print