রবিবার , ২২ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » ক্রিকেট » এনামুলের অদ্ভুত দলে ফেরা

এনামুলের অদ্ভুত দলে ফেরা

টেস্ট  ‘খেলা’ মানে অবশ্য মাঠের খেলা নয়। চারটি টেস্ট খেলেছেন, ৮ ইনিংসে রান ৭৩। গড় ৯.১২। তিনবার মাত্র দুই অঙ্ক ছুঁয়েছেন, সর্বোচ্চ ২২। টেস্ট ক্রিকেটকে সহজ মনে হওয়ার কোনোই কারণ নেই। কিন্তু এমন পারফরম্যান্সের পরও তো দলে ফিরেছেন, খুলনার একাদশে থাকার সম্ভাবনাও প্রবল। টেস্ট ব্যাটিংয়ের ভাষা এখনো শিখতে পারেননি, তবে টেস্টে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েই যাচ্ছেন। প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে এটাই।
এমন নয়, এনামুলের রান সংখ্যাই এর একমাত্র কারণ। ক্যারিয়ারে এর চেয়েও অনেক ভয়াবহ শুরু আছে অনেক বড় ব্যাটসম্যানের। গ্রাহাম গুচ ও সাঈদ আনোয়ার অভিষেক টেস্টে পেয়েছিলেন ‘চশমা’ বা জোড়া শূন্য। কেন রাদারফোর্ডের প্রথম ৭ টেস্ট ইনিংস ছিল ০, ০, ৪, ০,২, ১, ৫। শুরুকেই শেষ ধরে না নেওয়ার ক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ মানা হয় মারভান আতাপাত্তুকে। যাঁর প্রথম ৬টি টেস্ট ইনিংস ছিল ০, ০, ০, ১, ০, ০। প্রথম ফিফটি ১৮তম ইনিংসে। সেই আতাপাত্তু পরে ১৬টি সেঞ্চুরি করেছেন, যার ৬টি ডাবল। হয়ে উঠেছেন কেতাবি ব্যাটিংয়ের উদাহরণ। শুরুর ৬ ইনিংসে ১ রান করার পরও একজন আতাপাত্তুকে শ্রীলঙ্কা খেলিয়ে গেছে, কারণ তাঁর টেকনিক ছিল আঁটোসোঁটো, ভিত্তি ছিল শক্ত। এনামুলকে নিয়ে সংশয় এখানেই।
যে চারটি টেস্ট খেলেছেন, সব কটিতেই ছিল নিখাদ ব্যাটিং উইকেট। কিন্তু গলের ব্যাটিং স্বর্গ বা মিরপুর-চট্টগ্রাম-সেন্ট লুসিয়া, সব খানেই এনামুলের ব্যাটিং টেস্টে তাঁর টেকনিকের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বলের লাইনে পা যেতে চায় না, শরীর থেকে ব্যাট থাকে দূরে, ব্যাট-প্যাডের মাঝে ফাঁক থেকে যায় প্রায়ই। সুইং-বাউন্সে বাংলাদেশের সব ব্যাটসম্যানেরই কমবেশি সমস্যা আছে, কিন্তু এনামুলের সমস্যাটা একটু বেশিই চোখে পড়েছে। তাঁকে টেস্ট দল থেকে বাদ দেওয়ার সময়ও এটাই ছিল কারণ। এনামুল নিজেও বিসিবি একাদশের হয়ে কলকাতা যাওয়ার আগে নিজের উপলব্ধির কথা বলে গেছেন—টেকনিক নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে। সেই ‘কাজগুলো’ করার প্রয়োজন হয়নি, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলে এসেছেন দলে।
এনামুলের প্রতিভা নিয়ে সংশয় নেই। মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাটাও যে আছে, তা দেখিয়েছেন ওয়ানডেতে। টেকনিকে খুঁত নিয়ে সফল হওয়ার উদাহরণও টেস্ট ইতিহাসে কম নেই। তবে সেটি ন্যূনতম একটা পর্যায়ে থাকতেই হয়। এনামুল অনেক লম্বা দৌড়ের সম্ভাব্য ঘোড়া, অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে তাঁকে ভবিষ্যতের অধিনায়কও ভাবেন অনেকে। এই বয়সেই তাই টেকনিকের খুঁতগুলো সেরে ফেলা জরুরি। সেটি টেস্ট খেলতে খেলতে শেখা ভালো নাকি শিখে এসে খেলাটাই ভালো—এই প্রশ্ন অবধারিতভাবেই উঠবে। উত্তর যদি দ্বিতীয়টা হয়, উল্টো পথে হাঁটার দায় এনামুলের নয়। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় নির্বাচকদের।
এবার অবশ্য তাঁকে নিয়ে নির্বাচকেরা নতুন পরিকল্পনা করেছেন। তাঁকে ভাবা হচ্ছে লোয়ার মিডল অর্ডারে! সেখানে নতুন বল খেলতে হবে না বলে টেকনিকের ঘাটতি উতরে যাবেন, এই হলো ভাবনা। এনামুলকে দলে নেওয়া যতটা চমক, তার চেয়েও বেশি চমক দলে নেওয়ার এই কারণ। দেশে তাহলে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানের এমনই খরা যে একজন ওপেনারকে সাত-আট নম্বরে খেলানোর চিন্তা করতে হচ্ছে! অথচ টেস্ট স্কোয়াডেই আছেন শুরুতেই টেস্ট মেজাজের পরিচয় রাখা মার্শাল আইয়ুব। ২০১২ ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করার পর নাঈম ইসলাম আর সুযোগ পাননি, সর্বশেষ মৌসুমটা দুর্দান্ত কেটেছে মোহাম্মদ মিঠুনের। এনামুলকে মিডল অর্ডার বানিয়ে টেস্ট খেলানোর ভাবনাটাকে মার্শাল-নাঈম-মিঠুনরা তাঁদের প্রতি অন্যায় বলে মনে করতেই পারেন।
এনামুলের জন্যও কি খুব ভালো হচ্ছে এই ওপেনিং-মিডল অর্ডার টানাহেঁচড়া? একজন তরুণ সম্ভাবনাময় ব্যাটসম্যানের মনে নিজের অবস্থান-জায়গা নিয়ে সংশয় জাগানো তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য শুভ কিছু হওয়ার কথা নয়। বরং তাঁকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করানো ভবিষ্যতের জন্য ভালো। সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করে পরিণত হয়ে ফেরার জন্য সময়ও তো যথেষ্টই আছে এনামুলের হাতে।
খুলনায় শেষ পর্যন্ত যদি খেলেনই, রান করেও ফেলতে পারেন এনামুল। ধরে নেওয়া যাক, সেঞ্চুরিই করলেন। তাতেই কি নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত প্রশ্নাতীত হয়ে যাবে? দল নির্বাচনের সময় কখনো কখনো সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া। নাঈম-মিঠুনরা এখন এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন!


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print