সোমবার , ২৩ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী আর নেই

চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী আর নেই

কাইয়ুম চৌধুরীশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী আর নেই। আজ রোববার রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে উচ্চাঙ্গসংগীতের আসরে বক্তব্য দেওয়ার সময় কাইয়ুম চৌধুরী অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখান থেকে বরেণ্য এই শিল্পীকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান রাত নয়টার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিরউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাত ৯টায় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী মারা গেছেন। তিনি মারাত্মক হূদরোগে (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) আক্রান্ত হয়েছিলেন। সিএমএইচে আনার পর তাঁকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হয়েছে।’
রাত পৌনে ১০ টার দিকে স্বজনেরা কাইয়ুম চৌধুরীর মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমাগারে রাখার জন্য নিয়ে যান। তার মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হবে।

কাইয়ুম চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯৩৪ সালের ৯ মার্চ ফেনীতে গুণী এই শিল্পীর জন্ম। ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারে কাইয়ুম চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে অর্থের জৌলুস না থাকলেও শিক্ষা ও উদার মানসের জোরদার অবস্থান ছিল । পরিবারের এক সদস্য আমীনুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছিলেন নোয়াখালীর ইতিহাস। পিতা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ছিলেন সমবায় বিভাগের পরিদর্শক। পরবর্তী সময়ে তিনি সমবায় ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নোয়াখালীতে গোপাল হালদারের সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল। কুমিল্লায় গায়ক মোহাম্মদ হোসেন খসরু এবং লোকগানের সাধক শচীন দেববর্মনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। চট্টগ্রামের আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক যোগাযোগ ছিল । বাবার বদলির চাকরির সুবাদে কাইয়ুম চৌধুরী বাংলার অনেক এলাকায় ঘুরেছেন।

শিক্ষাজীবন
মক্তবে কাইয়ুম চৌধুরীর শিক্ষার হাতেখড়ি, তারপর ভর্তি হন চট্টগ্রামের নর্মাল স্কুলে। এরপর কিছুকাল কুমিল্লায় কাটিয়ে চলে যান নড়াইলে। চিত্রাপাড়ের এই শহরে কাটে তাঁর তিনটি বছর। সেখান থেকে সন্দ্বীপে এসে ভর্তি হন প্রথমে সন্দ্বীপ হাইস্কুলে ও পরে কারগিল হাইস্কুলে। এরপর নোয়াখালী জেলা সদরে কিছুকাল কাটিয়ে পিতার সঙ্গে তাঁর ঠাঁই বদল হয় ফেনীতে। ভর্তি হলেন ফেনী হাইস্কুলে, সেখান থেকে যান ফরিদপুরে। ফরিদপুর থেকে ময়মনসিংহ এসে ১৯৪৯ সালে সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। স্কুলজীবন থেকে আঁকাআঁকির প্রতি ঝোঁক ছিল কাইয়ুম চৌধুরীর। ১৯৪৯ সালে আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে কাইয়ুম চৌধুরী কৃতিত্বের সঙ্গে শিক্ষা সমাপন করেন ১৯৫৪ সালে। তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনকে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত আর্টস ইনস্টিটিউটের নবীন শিক্ষার্থীরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ইমদাদ হোসেন, মুর্তজা বশীর, আমিনুল ইসলাম, দেবদাস চক্রবর্তী প্রমুখ ছিলেন প্রতিবাদী আয়োজনের নিরলস কর্মী এবং সব মিছিলের পুরোভাগে। অন্তর্মুখী স্বভাবের কাইয়ুম চৌধুরীরও সম্পৃক্তি ছিল।

কর্মজীবন
১৯৫৫ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত কাইয়ুম চৌধুরী নানা ধরনের ব্যবহারিক কাজ করেছেন, বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, আর বইয়ের প্রচ্ছদ ও সচিত্রকরণের কাজ করেছেন । সিগনেটের বই কাইয়ুম চৌধুরীর জন্য ছিল এক অনুপম নিদর্শন। সাময়িক পত্রিকা বিষয়ে আগ্রহী কাইয়ুম চৌধুরী, ছায়াছবি নামে একটি চলচ্চিত্র সাময়িকী যুগ্ম ভাবে সম্পাদনা করেছিলেন কিছুকাল। সুযোগমতো টুকটাক প্রচ্ছদ আঁকছিলেন এবং এই কাজের সূত্রেই পরিচয় সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে। ১৯৫৫ সালে তাঁর দুই বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন, কিন্তু প্রকাশক অপারগ হওয়ায় সে বই আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রচ্ছদে একটি পালাবদল তিনি ঘটালেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত জহুরুল হকের সাত-সাঁতার গ্রন্থে। গ্রন্থের বক্তব্যের বা সারসত্যের প্রতিফলন ঘটালেন প্রচ্ছদে, একই সঙ্গে গ্রাফিক ডিজাইনে কুশলতা ও নতুন ভাবনার ছাপ মেলে ধরলেন। এমনই দক্ষতার যুগল মিলনে আঁকলেন ফজলে লোহানী রচিত কথাসরিত্‍সাগর-এর প্রচ্ছদ, যা প্রকাশিত হয়নি। গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদের সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার আত্মপ্রকাশ তাঁর অঙ্কন, টাইপোগ্রাফিবোধ ও রসসিঞ্চিত তির্যক রচনা প্রকাশের মাধ্যমে হয়ে উঠেছিল অনবদ্য। ১৯৫৭ সালে কাইয়ুম চৌধুরী আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেন।

শিল্পভাবনা
১৯৫৭ সালে সতীর্থ আমিনুল ইসলাম ও সৈয়দ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী গিয়েছিলেন কলকাতায়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের তরুণ কর্মকর্তা জিওফ্রে হেডলির আহ্বানে এই সফর। কলকাতায় দেখা করেছিলেন সত্যজিত রায় ও খালেদ চৌধুরীর সঙ্গে। ১৯৫৯ সালে বন্ধুবর গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদের সন্ধানী প্রকাশনী যাত্রা শুরু করে জহির রায়হানের শেষ বিকেলের মেয়ে গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে। ১৯৬১ সালে মাওলা ব্রাদার্স সৃজনশীল প্রকাশনার অধ্যায় উন্মোচন শুরু করে আবদুশ শাকুরের ক্ষীয়মাণ এবং সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যগ্রন্থ একদা এক রাজ্যে প্রকাশ দ্বারা। এই দুই প্রকাশনা সংস্থার কাজের পেছনে বরাবরই কাইয়ুম চৌধুরী সক্রিয় থেকেছেন। তিনি আরও প্রচ্ছদ আঁকেন ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে। ১৯৫৯ এবং ১৯৬১ সালে রেলওয়ের টাইমটেবিলের প্রচ্ছদ এঁকে সেরা পুরস্কারটি লাভ করেন কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি ১৯৬০ সালে তাহেরা খানমের সঙ্গে পরিণয়-বন্দনে আবদ্ধ হন, যিনি ছিলেন আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া প্রথম চারজন ছাত্রীর একজন। মনের সাযুজ্য তাঁর শৈল্পিক প্রয়াসের জন্য অনুকূল ছিল এবং স্ত্রীর ভূমিকা প্রেরণাদায়ক ছিল। ১৯৬১ সালে ডিজাইন সেন্টার ছেড়ে অবজারভার হাউসে চিফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। অবজারভার পত্রিকার রোববারের সাময়িকীতে ডিজাইন নিয়ে যেসব নিরীক্ষা করতেন তাঁর শিক্ষক জয়নুলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

শিল্পরীতি
তেলরং, জলরং, কালি-কলম, মোমরং, রেশম ছাপ ইত্যাদি নানা মাধ্যমে কাইয়ুম চৌধুরী কাজ করেছেন। তাঁর একটি প্রবণতা জ্যামিতিক আকৃতির অনুষঙ্গ। বস্তুত তাঁর ছবি নকশাপ্রধান। বর্ণিল পটভূমিতে মোটাদাগের নকশা তাঁর প্রধানতম অঙ্কনশৈলী। অন্যদিকে কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্রাবলি বর্ণোজ্জ্বল;—এই দিক থেকে আঁরি মাতিসের সঙ্গে তাঁর সমিলতা লক্ষণীয়। লাল, নীল, সবুজ এই তিনটি রং তিনি প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করে থাকেন। এই বর্ণভঙ্গী তাঁর চিত্ররীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর ক্যানভাসের আয়তন প্রায়শ বর্গাকার। এ ছাড়া তাঁর চিত্রাবলিতে এ দেশের লোকশিল্পসুলভ পুতুল, পাখা, হাঁড়ি, শীতলপাটি, কাঁথা ইত্যাদির পৌনঃপুনিক ব্যবহার লক্ষ করা যায়।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print