বুধবার , ১৫ আগস্ট ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » মাহির স্বপ্ন পূরণ হবে কী?

মাহির স্বপ্ন পূরণ হবে কী?

173সৈয়দ ফারুক হোসেন:

বাবা নেই, মাও চলে গেলেন না ফেরার দেশে, বাকীটা পথ কাকে নিয়ে কিভাবে বাঁচবে মাহি। কেন এমনটা হলো তার জীবনে। পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বাবা ও মা। তারাও তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। একাকি মাহি! এতটুকু বাচ্চা কী করে সইবে এ নির্মম বেদনা। এমন শোকে মুখের ভাষা লোপপায়, ঝরে শুধু চোখের অশ্রু। সে অশ্রুর রং হয় কালো যা কেবলই হৃদয়কে নাড়া দেয়। সেটি কোন ভাষা দিয়ে বুঝানো দায়। মাহির আকাশে কেবলই কালো মেঘ। দিগন্ত প্রসারিত অপলোক দৃষ্টি। সে দৃষ্টির ভাষা বোবা, কাউকে বুঝানো যায়না।

হৃদয় ফাটা আর্তনাদ মাহি কেবল ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে! চারিদিকে শুধুই অন্ধকার দেখছে। সে হয়তো একদিন বাবার মতো বড় হবে, কিন্তু অকালে হারানো পৃথিবীর এ অমূল্য সম্পদ আর কোন দিন ফিরে পাবে না। কি অপরাধ মাহি’র এতটুকু বয়সে বাবা মার সোহাগ, ভালবাসা থেকে আজ সে বঞ্চিত। প্রকৃতির নিষ্ঠুর নিয়ম। কার কাছে জবাব চাইবে, কেই বা কি জবাব দেবে তাকে। থেমে গেল তার আনন্দ ফূর্তি আর হাসিমুখে বাঁচার অধিকার। কারো সান্তনা দেবার ভাষা নেই। সে অবুঝ বলে জগৎ সংসারের অনেক কিছুই হয়তো তাকে বুঝানো সম্ভব, কিন্তু পিতৃ-মাতৃ-বিয়োগের ব্যাথা কাউকে বোঝানো যাবে না। আমিও পারবো না দু:সাধ্য সাধন করতে। যাকিছু পারি লিখতে, কলম আর চলছে না। অশ্রু সংবরণ করা কঠিন শুধু এতটুকু কামনা করি সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে ভালো রাখেন, তার শোক সইবার ক্ষমতা দান করেন।

মানুষের ক্ষুদ্র জীবনে যা ভালবাসার বন্ধনীতে আত্মিক স্পর্শতা জুড়ে পরিবার পরিজন। আমার তাকিয়ে দেখার শক্তি নেই! তবু মন জুড়ে প্রার্থনা করে চলে তাকে পরম করুণাময় শক্তি প্রদান করুক। যে শক্তিতে শোকে জর্জরিত ছেলেটি মা-বাবার দূরে চলে যাওয়াকে মেনে নিতে শিখে যায়। সাহসী হয় যেন আগামীকে জয় করতে তাকেই ধরতে হবে হাল।

মাহির বন্ধু তাশফি বলেন, “আগামী ১মে থেকে আমাদের ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। গতকাল (রবিবার) পর্যন্ত মাহি আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল। কিন্তু আজ আর কোন কথা বলছে না। সে নির্বাক হয়ে থাকছে। আমাদের স্কুলের শিক্ষকরা, বন্ধুরা, আত্মীয়রা তাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছে। তার মা ভালো আছেন, ভালো হয়ে ফিরবেন- এই সান্তনা দিচ্ছি’, এ কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তাশফি। এদিকে নেপাল থেকে ঢাকায় বাবার মরদেহ আসার খবর শুনে নানুর সঙ্গে বিকাল ৪টার দিকে শেষবারের মতো বাবাকে দেখতে যায় মাহি। সঙ্গে যান মাহির স্কুল শিক্ষক ও স্বজনেরাও।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের ইনফরমেশন বিভাগে দ্বিতীয়বার স্টোক করার পর তাকে লাইফসাপোর্টে রাখা হয়েছিল। শুক্রবার সকালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি। রোববার নিহত আবিদের স্ত্রী আফসানা খানম উত্তরার বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের ভর্তি করা হয়। হাসপাতালটির ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সিরাজি শফিকুল ইসলাম বলেন, রোববার ভর্তি হবার পর আফসানা খানমের মাথায় একটি অস্ত্রোপাচার করানো হয়েছিল। তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে আমরা পরিবারকে ব্রিফ করেছিলাম। অস্ত্রোপাচারের পর তাকে ৭২ ঘন্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। রোববার হাসপাতাল সূত্রে জানায়, আফসানা খানমের ব্রেইন স্ট্রোক হয়। তিনি অধ্যাপক ডা. বদরুল আলমের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ভর্তির পরপরই মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তে তার মাথায় একটি অস্ত্রোপাচার করা হয়।

১২ মার্চ নেপালে ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় পাইলট আবিদ সুলতান গুরুতর আহত হন। এ সময় তার শরীরের বেশিরভাগ অংশই পুড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর আহত ক্যাপ্টেন আবিদকে কাঠমান্ডুর নরভিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মার্চ তিনি মারা যান। এই বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫১ জন। নিহতদের মধ্যে আবিদ সলতানসহ ২৬ জন বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে ২৩ জনকে শনাক্ত করে সোমবার দেশে নিয়ে আসা হয়েছে।

আবিদ সুলতান, আমরা ডাকতাম ঘুড্ডু ভাই। ছোটবেলা থেকে ঘুড্ডু ভাই মেধাবী ছিলেন। মিরপুরের পল্লবী সিটি ক্লাব মাঠের উল্টোদিকে ঘুড্ডু ভাইদের বাড়ী। আমিও ঐ এলাকায় থাকতাম। বন্ধুবান্ধব পাড়াপ্রতিবেশী সবাই বলতেন ঘুড্ডু পাইলট হয়েছে, সবেমাত্র প্রশিক্ষণ শেষ করেছে। আমি একদিন ইচ্ছে করেই ঘুড্ডু ভাইয়ের সাথে দেখা করলাম। কারণ ছোটবেলা থেকে একজন পাইলটের সাথে দেখা পাওয়াটা স্বপ্নের মতো মনে হতো।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষিত যুদ্ধ বিমান চালনা কৌশলে সিদ্ধহস্ত একজন জিডি পাইলট। এর পরও রয়েছে তার ৫০০০ হাজার ঘন্টা ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতা। নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে শতাধিক উড্ডয়ন-অবতরণে সফল বৈমানিক-এর এবার হলো ছন্দ পতন! আর ফেরা হবে না। এবার একবারেই উড়ে পাড়ি জমালো না ফেরার দেশে।

উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত এর ঘটনার শোকে জর্জরিত মানুষের বিষাদ মন প্রিয়জন হারানোয় তখনও বেদনার্ত। রহস্য নিয়ে উড়োচিঠি তখনো ইন্টারনেট জালে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রান্তবদলে নানা মতের শীর্ণ ব্যাবচ্ছেদ। জীবন সঙ্গীর একই পথে হাটলো মৃত্যু পথের পথিক হয়ে এত অল্প সময়ে একাকীত্ব সইতে না পেরে! যে স্রোতে জীবন সঙ্গীর ভালবাসা অনুসরণ করলো মরণেও সঙ্গী হয়ে প্রিয় সহধর্মিণী আফসানা খাতুন।

আবিদের পরিবারে মূহুর্তেই যেন ঘটে গেল সুনামির ঝড়, যে ঝড়ে পরিবারের জোড়া প্রাণ প্রদীপ নিভে গেল সময় এক মুহূর্ত ব্যাবধানে, কাঁদিয়ে নি:সঙ্গ করে। স্মৃতিপটে আকা রঙিন ছবি মূহুর্তেই রঙ বদলে সাদাকালো হয়ে গেল যেন! এ যেন সিনেমাকেও হার মানালো। কি হবে মাহির? একাকি সে কি করে বাঁচবে! পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে কী? এযেন সহমরণ!

আফসানা বলেন, ‘এই বয়সে স্বামী হারানো এবং মাহির বাবা হারানোর কথা নয়। আমারও বেঁঁচে থাকার কোন মানে নেই।” তিনি নিজে মাহিকে রেখে নিয়তির কোলে সাড়া দিয়ে স্বার্থপরের মতো চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কী করবে একাকী মাহি, কে দেবে তাকে সান্তনা। মহান সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে এ দু:খ সইবার ক্ষমতা দেন। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে যেন মাহি আবার শক্ত হয়ে দাড়াতে পারে। এজন্য সবাই আমরা তার জন্য প্রার্থনা করি।

লেখকঃ ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print