সোমবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
মূলপাতা » অভিমত » বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ও বাস্তবতা

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ও বাস্তবতা

মানবাধিকার কর্মীমাহমুদা রিদিয়া রশ্মি: “আমরা বাল্যবিবাহ চাই না। এতে একটি শিশু আরেকটি শিশুর জন্ম দেয়। আর কখনই একটি শিশু ভালো মা হতে পারে না। এতে দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে”। কথা গুলো দশম শ্রেণীর ছাত্রী সাদিয়া আক্তারের। শর্তমুক্ত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের দাবিতে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির আয়োজিত সমাবেশে কথা গুলো বলেন সাদিয়া।

বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক সমস্যা যা আধুনিক সমাজের আধুনিক ব্যাধি হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন বা মধ্যযুগে বাল্যবিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের আধুনিক সমাজে বাল্যবিবাহ আইনসিদ্ধ তবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কথাটি এই অর্থে বলা যে, বাল্যবিবাহ বন্ধে রাষ্ট্র মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ তে রেখেছে কিন্তু আইনটির ১৯ ধারায় বিশেষ বিধান যোগ করেছে যা বাল্যবিবাহ বাড়াতে সহায়ক হবে। কারণ সমাজে একদল শোষক শ্রেণী ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটের’ দোহাই দিয়ে খুব কম বয়সে এমনকি ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে মেয়েদের বাধ্য করবে বিয়ে করতে। বাল্যবিবাহ হারের দিক থেকে পৃথিবীর অষ্টম স্থান অধিকারী বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রটি এই বিশেষ ধারার জন্য ইতিবাচক না নেতিবাচক হবে তা অনেকের ভাববার বিষয়।

দেখা যাক বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬ তে কী বলা আছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬ একটি নতুন আইন যা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯ কে প্রতিস্থাপন করবে। বাল্যবিয়েতে যে কোন পক্ষ অথবা উভয়পক্ষ এবং অভিভাবকরা যারা জেনে শুনে অপ্রাপ্তবয়সী শিশুদের বিয়ে দেবেন এই আইনের মাধ্যমে তাদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদন্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের মেয়ে শিশুদের অধিকার রক্ষায় এই আইনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের অভিভাবক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকে। মেয়েদের ভবিষ্যত ও মঙ্গলের কথা মাথায় রেখেই রাষ্ট্র এই আইনটিতে বিয়ের বয়স ১৮ রেখেছে। এতে রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাবার দাবিদার। রাষ্ট্রের এই  ইতিবাচক উদ্যোগে নারী সমাজ অবশ্যই সম্মানিত বোধ করেছে। কারণএই আইনটি গ্রামীণ সমাজের মেয়েদের অন্তত ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পড়াশুনা করার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। শধু তাই নয়, ১৮ বছর বয়সে একটি মেয়ের মানসিক পরিপক্বতা আসে। ফলে তার নিজের ভালো মন্দে সিদ্ধান্ত নিতে পারার সুযোগও তৈরী হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় এই যে, আইনটিতে বিশেষ কারণে আদালতের অনুমতিতে ১৮’র নিচে একটি মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সুযোগ রেখেছে। এই বিশেষ ধারায় উল্লেখ আছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে বিয়ে হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না। হয়তো বা কোন প্রেক্ষাপটকে বিবেচ্য বিষয় ধরে রাষ্ট্রকে এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বর্তমান সমাজে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা অবাধ মেলা মেশার ফলে আবেগ প্রবণ হয়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। এতে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ছে। তাদের শারীরিক ও মানষিক অপরিপক্বতার কারণে ঔ মূহুর্তে ছেলের পরিবার মেয়েটিকে সামাজিক ও বৈধ মর্যাদা দিতে নারাজ। তখন সমাজব্যবস্থার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে অনায়াসে মেয়েটি ও তার পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হচ্ছে। এরকম ক্ষতিগ্রস্থ মেয়েদের সমাজে সম্মানের সাথে বসবাস করার সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্র হয়তো বা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬ তে বিশেষ ধারা অব্যাহত রেখেছে যেন বিশেষ ধারাতে অপরিপক্ব মেয়েটির বিয়ে হয়। আবার উপরোক্ত প্রেক্ষাপটের জন্য বিশেষ ধারাটি নাও হতে পারে। যে কারণেই বিশেষ ধারাটি হোক না কেন বাস্তবিক অর্থে অল্পসংখ্যক মেয়েদের ক্ষেত্রে অনাকাঙ্খিত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বিশেষ আইনটি প্রযোজ্য হলেও বেশীরভাগ অপ্রাপ্তবয়স্ক নিরাপরাধ মেয়েদের বিশেষ কারণের দোহাই দিয়ে বিয়ে দেওয়া হবে।

একটু ভেবে দেখা যাক- ১৮’র আগে একটি মেয়ের শারীরিক গঠন পূর্ণতা পায় না। তাই ১৮ বা ২০’র আগে সন্তান জন্ম দিলে শিশুটি অপুষ্টির শিকার হতে পারে। এছাড়াও অপরিণত গর্ভধারণ, ফিস্টুলা, মাতৃত্বের ঝুঁকি ও প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা বৃদ্ধি পাবে বলে স্বাস্থ্যবিদদের আশংকা। এমনকি নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পাবে।

প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদসূত্রে জানা যায়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক জনাব মো: বেলাল হোসাইন সম্প্রতি বাংলাদেশের ১৪ টি জেলার ১০ হাজার মানুষের ওপর জরিপ করেছেন এবং তার গবেষণায় দেখিয়েছেন-দেশের বিবাহিত নারীদের ৯০ শতাংশই মনে করে ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন। ৯৪ শতাংশ নারীর মতে মেয়েদের বিয়ের উপযুক্ত বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর।

বাল্যবিবাহ একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ জেনেও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে বর্তমানে গ্রাম ও শহরে বসবাসরত বাবা-মা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অপরদিকে একশ্রেণী অভিভাবকদের মধ্যে মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বিরাজমান। এই বিশেষ ধারাটি বলবৎ থাকলে বাল্যবিবাহের হার বৃদ্ধি পাবার আশংকা থাকবে। বখাটেদের উত্ত্যক্ততা থেকে মুক্তি পেতে অভিভাবকরা বিশেষ কারণকে ব্যবহার করে স্কুল পড়–য়া মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে। মেয়েটি সংসার করতে সক্ষম না হওয়ায় তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হবে এমনকি তালাক ও হতে পারে।

লাইন দুয়েক অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যাক। আমার এক সহকর্মী প্রচন্ড পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে বললেন- ভালো ছেলে পেলে বিশেষ কারণের দোহাই দিয়ে ১৮’র নিচে এমনকি ১০/১২ বছরের মেয়েদের অবশ্যই বিয়ে দেওয়া উচিত। শুধুমাত্র ভালো চাকুরি করাকে ভালো ছেলের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ফেলেন তিনি। প্রশ্ন হলো সুন্দর মানসিকতা ও সচ্চরিত্র কী ভালোর বৈশিষ্ট্য নয়? তিনি আরও বলেন- স্ত্রীর পড়াশুনা ও চাকরি করার প্রয়োজন নেই। স্ত্রী থাকবে ঘরে। এই যদি হয় সমাজের ছেলেদের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব তবে একশ্রেণী সুযোগ নেবে বিশেষ ধারাটি অপব্যবহারের। যদিও রাষ্ট্র ইতিবাচক দিক চিন্তা করে বিশেষ ধারাটি রেখেছে তবুও বিশেষ ধারাটি কার্যকরের আগে নেতিবাচক দিকটি অবশ্যই ভাবতে হবে।

ইউএনওকে ফোন দিয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছিল একটি মেয়ে। অপরদিকে ঝালকাঠির শারমিন আক্তার মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল নিজের বিয়ে ঠেকাতে। কিন্তু বর্তমান আইনে যদি বিশেষ কারণে ১৮’র নিচে বিয়ের বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেখ থাকে তবে শারমিনের মত হাজারও মেয়ে বাল্যবিবাহ ঠেকাতে প্রশাসনের কোন সাহায্য না পেয়ে হতাশায় হিমশিম খাবে। যদি এমন হত বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো রিসার্চ করে জানা যেত যে, ১৮’র নিচে কত জন মেয়ে পড়াশুনায় আগ্রহী কিন্তু পরিবারের চাপের মুখে আদালতের বিশেষ অনুমতিতে তাদের বিয়ে করতে হচ্ছে। যদি সংখ্যা বেশী হয় তবে কী বিশেষ আইনটি পরিবর্তন করা যেত না। কারণ স্বশিক্ষায় শিক্ষত হয়ে স্বনির্ভর হওয়ার অধিকার প্রতিটি মেয়ের আছে।

একটি মেয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জনের আগেই যদি বিয়ে দেওয়া হয় তবে সেটা তার জন্য অভিশাপ স্বরূপ। তাই বিশেষ আইনটি প্রত্যাহার করে মেয়েদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া অতীব জরুরী।

লেখক, মানবাধিকার কর্মী।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য কর্তৃপক্ষ লেখকের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print