সোমবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
মূলপাতা » নিবন্ধ » বাঙালি সংস্কৃতির চেতনায় জাগ্রত হোক তরুণ প্রজন্ম

বাঙালি সংস্কৃতির চেতনায় জাগ্রত হোক তরুণ প্রজন্ম

মিথুনবিশ্বের প্রতিটি মানুষ কোন না কোন সংস্কৃতির। একটি নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ডের  সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠে মানুষের জীবন। প্রত্যেকের পরিচয় তার সংস্কৃতির মাধ্যমেই ফুটে উঠে।স্বতন্ত্র বৈশিষ্ঠ্যমন্ডিত সংস্কৃতির আবহে ভিন্ন ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থা। রবার্ট কোহলস-এর মতে সংস্কৃতি হলো একটি সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা। একটি জাতির আচার-ব্যবহার, সামাজিক সম্পর্ক, মনন, চিন্তা, কর্ম ইত্যাদি নিয়েই সংস্কৃতি। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, সংস্কৃতি হলো মানুষের গোটা জীবনাচরণ। সংস্কৃতি একটি জাতির ধারক এবং বাহক। সংস্কৃতি সর্বদা ইতিবাচক বিষয়াবলীকে নির্দেশ করে। জাতি গঠনের অন্যতম হাতিয়ার সংস্কৃতির গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী রয়েছে নানা সংস্কৃতি।

প্রত্যেক জাতির সংস্কৃতি একে অপর থেকে স্বতন্ত্র। এমনকি একটি দেশেও অনেকগুলো স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি রয়েছে। বিশ্বের কোনো সংস্কৃতিকেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। প্রত্যেক জাতিই তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করে এবং শ্রদ্ধা জানায়। বাঙালি জাতিরও রয়েছে শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বাঙালি সংস্কৃতি গৌরবের জীবনযাপনের ব্যবস্থা এবং আত্মপরিচয়ের প্রধান নিয়ামক। বাঙালির সংস্কৃতি অহংকারের এবং মানবতার সংস্কৃতি। হিন্দু, বৌদ্ধ, খিস্ট্রান, মুসলমানসহ নানা জাতি, বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের লোকজনের সহ-অবস্থানের  মাধ্যমে এক অনন্য ভাবধারায় প্রবাহিত আমাদের সংস্কৃতি।

বাঙালিত্ব এবং বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষার জন্য একাত্তরে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন ত্রিশ লাখ শহীদ। বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে সংস্কৃতির নানা উপকরণ। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষের আচার, অনুষ্ঠান, বিশ্বাস, জীবনচার নিয়ে বাঙালির সংস্কৃতি। বাঙালির আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, মূল্যবোধ, ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, সামাজিক সম্পর্ক, মনন, চিন্তা, কর্মসহ সবকিছুই মানবিক, সুষ্ঠু, সুন্দর এবং সমৃদ্ধ জীবনযাপনের পাথেয়। বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। গোটা বিশ্বকে যখন একটি গ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, তখন কোনো জাতির পক্ষেই তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখা সম্ভব নয়। এক দেশের সাথে অন্য দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা জীবন ধারণের নানা উপকরণের অবাধ আদান-প্রদানের মতোই প্রতিনিয়ত সাংস্কৃতিক বিষয়াবলীর লেনদেন ঘটছে।

তথ্য-প্রযুক্তির সুবাদে আকাশ সংস্কৃতির যুগে কেবল নিজস্ব সংস্কৃতিকে প্রথাগতভাবে নেমে চলার কোনো সুযোগ নেই। সংস্কৃতিতে প্রতিনিয়ত ঘটছে সংযোজন এবং বিয়োজন। পরিবর্তনের  ধারায় নিজেকে মানানসই করে নিতে সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রার যোগ হবে, আবার অনেক কিছু হারিয়ে যাবে- এমনটিই স্বাভাবিক। তাই বলে নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে অন্য সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়ার মাঝেও কোনো সার্থকতা নেই। কিন্তু ভাবনার বিষয় হচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। তারা কি বাঙালি সংস্কৃতিপনার মাঝে বেড়ে উঠছে ? আমাদের গৌরবের সংস্কৃতি কি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছে? নাকি তাদের উপর বেশি ভর করছে ভিন্ন সংস্কৃতি?

একুশ শতাব্দীর উদীয়মান সংস্কৃতি আমাদের শত বছরের সংস্কৃতির মাঝে পার্থক্যের রেখা টানছে কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার। তরুণ প্রজন্ম যদি বাঙালি সংস্কৃতিবিমুখ হয়, তবে এখনই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যান্য সংস্কৃতির বলয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তরুণ প্রজন্মের কাছে আমাদের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে। এক প্রজন্মের কাছে অন্য প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের রয়েছে কার্যকর ভূমিকা। একটি সমাজের মানুষের কাছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগত বিষয়াবলী উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের যে ক্ষমতা রয়েছে তা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের গণমাধ্যম কি বাঙালি সংস্কৃতিকে তরুণ প্রজন্মের নিকট যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারছে। বর্তমানে দেশে ভিনদেশী টিভি চ্যানেলের প্রাধান্য বেশি। বিশেষ করে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের দাপটে বাঙালি সংস্কৃতি অনেকাংশে চুপসে যাচ্ছে। ভারতীয় সোপ অপেরার সংস্কৃতি ভর করছে বাঙালি সংস্কৃতিতে। যা লোকজনকে শেখাচ্ছে পোশাক পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে জীবনযাপনের অন্যান্য বিষয়াবলী নির্ধারণ করতে। ভারতীয় এই মেগা সিরিয়ালের কৃত্রিমতা মনে প্রাণে গ্রহণ করছে নারী সমাজ। যেখানে কেবলই রয়েছে পারিবারিক কলহ বিবাদ।

বাঙালি সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে ভারতীয় চ্যানেলের দাপট কমাতে হবে। এই বাংলায় জন্ম নেয়া শিল্পীদের গান মানুষের মন ছুঁয়ে যায়, মানবতার কথা বলে।সিরাজ শাহ, লালন শাহ, হাসন রাজা, আব্বাস উদ্দীন,আব্দুল আলীমের মতো শিল্পীর জন্ম এই বাংলায়। তাঁদের রচিত গান পৃথিবীর যেকোনো সংস্কৃতি এবং সমাজে প্রশংসার দাবিদার। আমাদের নতুন আর কোনো গানের দরকার নেই। তারা যা দিয়ে গেছেন সেগুলোই যথেষ্ট। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে আমাদের তরুণদের মুখে সেসব গান খুবই কম স্থান পাচ্ছে। তরুণরা পরিচিত হয়ে উঠছে না বাংলার কিংবদন্তী-শিল্পীদের সাথে।

বাঙালির সংস্কৃতির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে সংস্কৃতি দিয়েই।আমাদের শিল্প, কলা, সাহিত্য অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। বাঙালি সংস্কৃতির গুণকীর্তন করার অনেক কিছুই রয়েছে। তবে এখন সময় এসেছে আমাদের সংস্কৃতির বন্দনার মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং সংস্কৃতিকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার। পুঁজিবাদের যুগে কেবল অন্যদের সংস্কৃতির গুণকীর্তন না করে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হবে। তরুণদের যেভাবেই হোক বাঙালি সংস্কৃতির আবহে জীবন ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে। ইতোমধ্যে বাঙালি সংস্কৃতির অনেক কিছুই বিলুপ্তপ্রায়।

যাত্রাপালা, জারিগান, সারিগান, কবিগান হারিয়ে গেছে। অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে বাঙালির অনেক উৎসব। কিন্তু এই সব বাঙালির অমূল্য সম্পদ এবং স্বকীয়তা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল বাঙালি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি এতোটাই জনপ্রিয় ছিল যে তারা এখানে গোড়াপত্তন করেছিল। আমরা যেমন অন্যদের সংস্কৃতিকে নিজেদের অজানতে গ্রহণ করছি, তেমনি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকেও অন্যদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।বাঙালি সংস্কৃতির এমন কিছু গুণ রয়েছে, যা অন্যদের নিকট জনপ্রিয়তা অর্জন করার সক্ষমতা রাখে।

ইদানীং আমাদের সমাজে সাংস্কৃতিক বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে এক পক্ষে তরুণ প্রজন্ম অন্যদিকে বয়স্করা। তরুণরা অনেক কিছুই গ্রহণ করছে, যা বয়স্করা মেনে নিতে পারছেন না। আবার বয়স্কদের সেই সব গান, নাটক, সিনেমা সামাজিক রীতিনীতিতে তরুণ প্রজন্ম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। কিন্তু সাংস্কৃতিক এই বিভেদ থাকা ঠিক নয়। আমাদের সমাজ বাস্তবতায় উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনই যুক্তিসম্মত।

কোনো জাতি যদি তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে অবহেলা করে, তবে সেই জাতির পক্ষে কোনকিছুই শুভ এবং কল্যাণকর হবে না। নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা না করলে ভিনদেশী সংস্কৃতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। আমরা বাঙালি জাতি আজ অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি, যার ফলে সমাজে অনাকাঙ্ক্ষিত নানা ঘটনাই ঘটছে। তবে সামাজিক মাধ্যমের যুগে অনেক কিছু যোগ হবে, তবে তা যেন আমাদের নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে হয়, সেই দিকে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে। কেবল অপরের সংস্কৃতি নিয়ে গৌরব করার মাঝে কোনো সার্থকতা নেই। নিজস্ব সংস্কৃতিকে মনে প্রাণে ধারণ করাই প্রকৃত গৌরব। আপন গৌরবে বেড়ে উঠুক আমাদের তরুণ প্রজন্ম। সেক্ষেত্রে প্রথমে প্রাধান্য দিতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে। আপন মহিমায় বিকশিত হোক বাঙালি সংস্কৃতি।

(লেখক: প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print