মঙ্গলবার , ২৪ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » নিবন্ধ » জবি’র হল আন্দোলন ও প্রশাসনের দায়

জবি’র হল আন্দোলন ও প্রশাসনের দায়

milton hallজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান গত বছর (২০১৫) আবাসিক হলের দাবিতে চলা আন্দোলন সম্পর্কে একাধিক কলাম এবং টিভি টকশোতে বিস্তারিতভাবে বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন। স্থানান্তরিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জায়গা চেয়ে চলতি মাসে(আগস্ট ২০১৬) শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কেও ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তিনি। ৮ আগস্ট জরুরি একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডেকে সরকারের কাছে ওই কারাগারের জায়গা যথাযথ ব্যবহারের নিশ্চয়তা দিয়ে বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।

উপরন্তু ২১ আগস্ট শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলার জন্য শিক্ষক প্রতিনিধি নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। উপাচার্য হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গা নিয়ে ইতোমধ্যে আন্তরিক প্রচেষ্টার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এক হাজার ছাত্রীর থাকার জন্য বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের প্রথম তলার কাজ শেষ হয়েছে।

কেরাণীগঞ্জে জমি কেনা হয়েছে ছাত্র হল এবং একাডেমিক ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে। বর্তমান উপাচার্যের তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ ঈর্ষণীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। চলতি মাসে বিসিএস ক্যাডারেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী চাকরি পেয়েছেন। অন্যান্য বিবিধি পদে সরকারি চাকরিতে তারা মেধার পরিচয় দিয়ে আসছে। ‘হল’ ছাড়াই নানা প্রতিকূলতা জয় করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের কৃতিত্ব অর্জন করছে।

আসলে ‘হল আন্দোলন’ ইদানিং কালের নয়। ২০০৫ সালে কোনো ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়াই তড়িঘড়ি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। অন্যান্য নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তা হয়নি। যেমন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বড় জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এমনটি হয়নি।

ফলে জন্মগত একটি ত্রুটি রয়ে গেছে। দেড়শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কলেজ ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সেই কলেজের প্রচুর ছাত্রাবাস ছিল। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা থাকত। ধারণা করা হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় আবাসিক হলগুলো হস্তান্তর করা হবে।

উপাচার্য ড. মীজানুর রহমানের মতে, ‘মাত্র ৭.৫০ (সাড়ে সাত) একর জায়গার উপর ২০ হাজার শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের বিষয়টি চিন্তা না করেই কলেজ থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। অপরদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে সাতশ একর জায়গা, কিন্তু শিক্ষার্থী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অর্ধেক। কেবল তাই নয়, প্রতিষ্ঠাকালীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে তৈরি করা হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে কথা ছিল, শিক্ষার্থীরাই টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চালাবে। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এ আইন সংশোধন করে। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও রাষ্ট্রীয় খরচে চলবে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা নিশ্চিত করেন। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমস্যা হল সম্পূর্ণ অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু তাই নয়, ক্লাসরুম, শিক্ষক শিক্ষা উপকরণ সংকট থেকে শুরু করে নানা সমস্যা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা কষ্ট করে শিক্ষা গ্রহণ করছে। তাদের পরিবহণ ব্যবস্থাও অপ্রতুল। বাসের ব্যবস্থা থাকলেও যানজটের কারণে বাসগুলো ঠিকমত চলতে পারে না।

শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট করে ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যে মেসে অবস্থান করতে হয়ে। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের আরো দুরবস্থা। আবাসিক হলে কোনো ব্যবস্থা না থাকায় নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা শতকরা ১০ ভাগ। কাজেই যুক্তিসঙ্গতভাবেই শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলন করছে। উদ্ধারের জন্য এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেলাপ্রশাসক নিয়ে বহু সভা, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। ১২ টি হলের মধ্যে আমরা হাবিবুর রহমান হলের লিজ পেয়েছি। এটি বর্তমানে আমাদের দখলে রয়েছে।

বাণীভবন নামে আর একটি হলে আগে থেকেই আমাদের কর্মচারী থাকায় সেটিও দখলে আছে। এই দুইটি হল আমাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা নামে নতুন যে হল নির্মাণ চলছে তা সরকারের কেনা জায়গায়। ১০ বিঘা জমির উপর হল নির্মাণের সকল উদ্যোগ সম্পন্ন হয়েছে। পুরান ঢাকার ভূমিদস্যুরা কাজগপত্র এমনভাবে তৈরি করেছে তা অনেক পুরানো। ব্রিটিশ আমলে ১৯৪৫ সালে ভারতের নদীয়ায় দলিল তৈরি করে এসব হল দখল করা হয়। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের রায় তাদের পক্ষে। তবে ৩/৪টি সেই অর্থে দখল হয়নি।

হলের জায়গায় বড় ধরনের অবকাঠামোগত নির্মাণ হয়নি। কিছু হলে পুলিশ থাকে. সেগুলো হস্তান্তর হতে পারে। বর্তমান আন্দোলনের ফলে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবাই অবগত আছেন। প্রশাসনের লোকজন অভ্যন্তরীণভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পুলিশের যে সব হলে অবস্থান করছে, সেগুলো হস্তান্তর করলে শিক্ষার্থীরা কিছু হলেও আবাসনের ব্যবস্থা পেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ভবন ক্যাম্পাস সংলগ্ন হয়ে আছে। ৭ একর জায়গার মধ্যে ত্রিভুজ আকৃতির এ ভবন নিয়েও আন্দোলন চলছে। এক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলে পরে তা সফল হয় না। এতো অল্প জায়গার মধ্যে ২০ হাজার শিক্ষার্থীর অবস্থান করা সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ কারো কোনো আবাসিক ব্যবস্থা নেই।

কিন্তু ২০০৫ সালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগেই হলগুলো বেহাত হয়ে যায়। বিভিন্ন ভূমিদস্যু, ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালীরা এসব হল দখল করে কাগজপত্র তৈরি করে নেয়। আগেই বলেছি বর্তমানে কয়েকটি হল উদ্ধার করা হলেও বাকিগুলো এখনও বেহাত রয়েছে। তবে আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল উদ্ধারের দায়িত্ব শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের হওয়া উচিত নয়। কারণ আমরা হল উদ্ধার করতে পারি না। নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। হলগুলো উদ্ধারের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

সেদিক থেকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ খুবই আন্তরিক। দু’বছর আগে হল উদ্ধারের বিষয়ে কমিটি গঠন করা হয়। হল দখল করা কোনো ভাবেই ছাত্র-শিক্ষকদের কাজ নয়। শিক্ষকরা পড়াবেন শিক্ষার্থীরা পড়বেন। এসব হলের জায়গা এখনও সরকারের। কিন্তু খাস জায়গা হিসেবে নামে-বেনামে হলগুলো দখল করেছে অন্যরা। দখলকারীরা দলিলও তৈরি করে নিয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে জাল দলিল তৈরি করা সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাক্ষ্য দিতে পারবেন- হলগুলোতে জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা ছিলেন।

সরকার হলগুলো উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালকে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা তা পাইনি। হলগুলোতে মার্কেট নির্মাণসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে। এর আগে হল উদ্ধারের জন্য আমলাদের নিয়ে কমিটি হয়। তারা চেষ্টা করেছেন কিন্তু কাজ হয়নি। বর্তমান উপাচার্যের আমলে স্থানীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। তিনি নিজেই ওই কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং তিনবার ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এ কমিটি কেবল প্রতিবেদন নয় বরং হল উদ্ধারে নিয়োজিত রয়েছে। কিছু কিছু হল এখনও এমন অবস্থায় রয়েছে, যেগুলো সেই অর্থে ভূমিদস্যুরা দখল করেনি। কয়েকটি হলে সরকারের পুলিশ বাহিনী রয়েছে। কাজেই এখনও উদ্ধারের সুযোগ রয়েছে। ফলে কিছু জমি আমরা তাৎক্ষণিকভাবে পেতে পারি। কিন্তু সমস্ত হল এবং জায়গা উদ্ধার হওয়ার পরও আমাদের সমস্যার সমাধান হবে না।

পুরান ঢাকার মতো জাগয়ায় এতো সংখ্যক শিক্ষার্থীদের আবাসিক সমস্যার সমাধান বাস্তবিকই কঠিন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মচারীদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা জায়গা দরকার। তা বুড়িগঙ্গা নদীর ওই পারে হলে ভালো হয়। আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছি যাতে ১০ একর জায়গা হলেও যেন আমাদের দেওয়া হয়। যাতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল নির্মাণ করতে পারি। বর্তমান ক্যাম্পাসে আমরা একাডেমিক কার্যক্রম চালাবো।’

বাস্তবতা হলো জগন্নাথ কলেজের জায়গা অর্থাৎ হলগুলো দখলের পর ভূমিদস্যুরা আবার বিক্রি করেছে। নানাভাবে এগুলো হাত বদল হয়েছে। ফলে এক ধরনের জটিলতা বিরাজ করছে। কিন্তু তারপরও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে হলগুলো উদ্ধার করতেই হবে। হল উদ্ধার কমিটির কাছে আমাদের অনুরোধ, এখনও যেসব হল সেই অর্থে দখল হয়নি- যেমন তিন চারটি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।

এগুলো উদ্ধার করা সম্ভব। আর এতে শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও মাথা গোছার ঠাঁই পাবে। বাকিগুলো আইনী প্রক্রিয়ায় সময় নিয়ে উদ্ধার করতেই হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাজ হচ্ছে, সরকারের কাছ থেকে টাকা আদায় করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রদান করা। জগন্নাথের বিষয়ে তাদের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

আমাদের দেশের কৃষ্টি কালচার, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জ্ঞানার্জন করবে।
একজন মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এবং আদর্শ চরিত্রের অধিকারী শিক্ষার্থী পেতে হলে তাদের অভাব-অভিযোগের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

কারাগারের জমি সরকার কাকে দেবে সেটি এখনো নির্দিষ্ট হয়নি। তবে কি করবে তা সংবাদপত্রে প্রকাশ পেয়েছে। তবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে তারা সেই জমি পেলে বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতার নামে হল, গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে সমস্যার সমাধান করবেন বলে আমরা মনে করি। জঙ্গিবাদী সহিংসতা ও নাশকতার আশঙ্কা থাকায় শিক্ষার্থীরা সতর্ক হবে ‘হল-আন্দোলনে’ সেই প্রত্যাশাও আমাদের।

ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
writermiltonbiswas@gmail.com


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print