শুক্রবার , ২২ জুন ২০১৮
মূলপাতা » অভিমত » পরীক্ষার্থীরা ফেল করবে কেন?

পরীক্ষার্থীরা ফেল করবে কেন?

Mithun-Miya-‘গণমাধ্যম কেন জানি শুধু পাস করা শিক্ষার্থীদের দেখায়, মতামত নেয়। ফেল করা শিক্ষার্থীরা কী সমাজের বাইরে। এ বছর মোট এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ২৬% ফেল করেছে। অথচ তাদের কেউ গণমাধ্যমে স্থান পায়নি। গণমাধ্যম যদি ফেল করা শিক্ষার্থীর মতামত তুলে আনতো তবে কী খুব মন্দ হতো? শিক্ষার্থীরা কেন ফেল করলো? এর জন্য কারা দায়ী? গণমাধ্যমকে ধরা হতো সমালোচনার মাধ্যম। আর এখন গণমাধ্যমেরই সমালোচনা করতে হচ্ছে।’’ এটি আমার এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক স্ট্যাটাস। তার এই মন্তব্যের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। তার এই স্ট্যাটাসের সাথে যুক্ত রয়েছে আরো অনেক বিষয়।

গত বৃহস্পতিবার সারাদেশে একযোগে ২০১৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে,  উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে গত বছরের ছন্দপতনের পর এবার আবার ভালো ফলের আনন্দে অবগাহন করেছে পরীক্ষার্থীরা। এবার পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তি বেড়েছে। ২০০৫ সালের পর এ স্তরের শিক্ষার্থীরা ফলের দিক থেকে ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখে ধাবিত হচ্ছিল। গতবার সেখানে ছন্দপতন ঘটে। সব শিক্ষা বোর্ড এবার সাফল্যের ধারায় ফিরে এসেছে। যশোর বোর্ডে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার বেড়েছে ৩৭ ভাগ।

এবার ১০টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সারাদেশে ১২ লাখ ৩ হাজার ৬৪০ জন ছাত্রছাত্রী অংশ নেন। তাদের মাঝে পাস করেছেন ৮ লাখ ৯৯ হাজার ১৫০ জন। ১০ বোর্ডে গড় পাসের হার ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। গত বছর গড় পাসের হার ছিল ৬৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। সর্বোচ্চ ফল জিপিএ ৫ পেয়েছেন ৫৮ হাজার ২৭৬ জন। গতবারের চেয়ে এবার জিপিএ ৫ বেড়েছে ১৫ হাজার ৩৮২ জন। জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে ঢাকা বোর্ড শীর্ষে থাকলেও পাসের হারে যশোর বোর্ড সবার চেয়ে এগিয়ে। শতভাগ পাস করা কলেজ ও মাদ্রাসার সংখ্যা এবার বেড়েছে। অন্যদিকে শূন্য পাসকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। পাসের হারে মেয়েরাই এবার এগিয়ে রয়েছে। তবে জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে ছেলেদেরই জয়জয়কার। পাসের দিক থেকে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার পরীক্ষার্থীদের অনায়াসে পেছনে ফেলেছেন বিজ্ঞান শিক্ষার্থীরা। জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতেও তারাই শীর্ষে, ৮৫ ভাগ। তবে এত ভালো ফলের পরেও সারাদেশে ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৯০ জন ছাত্রছাত্রী পাস করতে পারেননি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ৩ লাখ ৪ হাজার ৪৯০ জন ছাত্রছাত্রী অকৃতকার্য হলো কেন? পাসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার পিছনে কারণ কী?  বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। এ যুগে শিক্ষার যেমন বিকল্প নেই তেমনি সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ-সুবিধাও সহজলভ্য। দেশে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা। এই সরকারের শিক্ষা খাতে সাফল্য আকাশচুম্বী। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রয়েছেন ভালো শিক্ষকরাও। অভিভাবকরাও সচেতন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বপ্রথম বাংলাদেশে বিনামূল্য পাঠ্য বই বিতরণ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা। এতো কিছুর পরও কেন একজন শিক্ষার্থী এ যুগে পরীক্ষায় ফেল করবে। ফেল করে কান্নামাখা মুখ এ সমাজ দেখতে পছন্দ করে না। পরীক্ষা মানেই পাস ফেল থাকবেই- আমার মনে হয় এই ধারণার বাস্তবতা আজ থেকে ৩০/৪০ বছর আগে ছিল। মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল করা এখন অসম্ভব বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন পাস করাটাই স্বাভাবিক, ফেল করাটাই অস্বাভাবিক।

তবে এই সব শিক্ষাথীদের ফেল করার নেপথ্যে কারণ কী ? আমার ওই ছাত্রের প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ। তারা কি নিয়মিত পড়াশুনা করে না। যদি তাই হয়, তবে তার অভিভাবকরা কী করেন। শিক্ষকরা ভালোভাবে পাঠদান করান না। তাহলে স্কুল কিংবা কলেজের ম্যানেজিং কমিটি কী করে? শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে দুর্বল। তাহলে বিশেষ যত্ম নেয়া হয় না কেন। কিংবা শিক্ষার্থীদের অর্থের অভাব। তবে উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে না কেন?

দেশ যখন সকল দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে শিক্ষা খাতে। শিক্ষাই সকল উন্নয়নের চাবিকাঠি। শিক্ষার বিকল্প শিক্ষাই। আমরা তো চাইতেই পারি শতভাগ পাশ করুক আমাদের শিক্ষার্থীরা। আমার মনে হয় তা অসম্ভব কিছুই নয়। শতভাগ সুযোগ থাকলে কেন শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করবে না। কাজেই এখন সময় এসেছে শতভাগ পাস না করার কারণ অনুসন্ধান করা।

আমার ওই শিক্ষার্থীর ফেসবুক স্ট্যাটাসের অভিযোগের আঙ্গুল দেশের গণমাধ্যমের দিকে। সত্যিই তো আমাদের গণমাধ্যম কেবল পাস করা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যস্ত। বারবার দেখানো হয় তাদের আনন্দ উল্লাস। কিন্তু একজন অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের নিকট আমাদের গণমাধ্যম যায় না। পাস এবং ফেল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভক্তির রেখা টানছে গণমাধ্যম।

আমি তো মনে করি কৃতকার্য একজন শিক্ষার্থীর চেয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর দিকে বেশি নজর দেয়া উচিত ছিল আমাদের গণমাধ্যমের ।  ফেল করা শিক্ষার্থীদের নিকট গিয়ে গণমাধ্যমের জানা উচিত ছিল তাদের মনের কথা। তারা ফেল করলো কেন? তাদের দুর্বলতা কোথায় ছিল? তারা কি পেয়েছে আর কি পায়নি। যারা পাস করেছে তাদের নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যারা ফেল করেছে তাদেরকে নিয়ে।  অকৃতকার্যদের মনে ফের বল জোগানো, অনুপ্রেরণা দেয়ার কাজটি আমাদের গণমাধ্যম নিঃসন্দেহে করতে পারে। এটিই গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। সাংবাদিকতা হওয়া উচিত নিরাশার বুকে আশা জন্মানোর জন্য, তাকে তার জায়গায় উপনীত করা জন্য। তাকে হতাশ কিংবা অন্যদের নিকট থেকে বিভক্ত করার জন্য নয়। কাজেই কেবল গণমাধ্যম নয়, আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক সকলের উচিত অকৃতকার্যদের দিকে নজর দেয়া। তবেই প্রত্যেক বছরই শতকরা পাসের হার বাড়বে। একটি সময় আমরা শতভাগ পাসের তালিকায় যুক্ত হতে পারবো।

লেখক: প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print