সোমবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
মূলপাতা » অভিমত » মা`র কাছে হলহীন সন্তানের চিঠি

মা`র কাছে হলহীন সন্তানের চিঠি

14088আকিদুল ইসলাম : আজ আমি পুলিশের জলকামানের পানি দেখেছি। সে পানির রং নীল নাকি বেগুনি সেটা ভাববার কোন সময় পাই নি। শুধু মনে হলো পানির অপর নাম যে জীবন, সেটা এ পানি না। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদের মধ্যে খোলা রাস্তায় যখন তোমার মতো হাজারো মায়ের সন্তানেরা তাদের ন্যায্য, যৌক্তিক অধিকারের স্বপ্নের জন্য চিৎকার করছে তখন কি বসে থাকা যায় বলো?

রাস্তার উপরে জ্বালানো টায়ারের জ্বলন্ত আগুনের সাথে কালো ধোঁয়ার কুন্ডুলি পাকিয়ে কেমন যেন পতপত করে উপরে উঠছিলো। তার সাথে তাল মিলিয়ে তোমার এক ছেলেই শুধু না, ২০ হাজার মায়ের সন্তানেরা হল চাই হল চাই বলে চিৎকার করছিলো।

তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছো মা? না বুঝলেও তোমাকেই বলবো এই কথাগুলো। তোমার মতো করে এমন ভাবে কেউ শুনবে না অামার এ আকুতি,বেদনা আর অতৃপ্তির কথা। কারণ তুমি তো মা। তবে তোমার সন্তানের কথা শুনে বরং তোমার কষ্টই বাড়বে।

তুমিতো জানো না মা! ১৯৭১ সালে হাজারো সন্তানেরা তাদের হৃদয়ের ভেতরে লুকায়িত স্বপ্ন বাস্তাবায়নের জন্য ‍যুদ্ধে গিয়ে মায়ের কাছেই সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছিলো। সেই রকম গর্বিত সন্তান আমি না, মা। তবে তাঁরা যেমন তাদের জীবনের সবচেয়ে চরম মুহূর্তে মাকে চিঠি লিখে জানিয়ে ছিলো তাদের স্বপ্নের কথা, তেমনি আমিও শুধু আমার না বলা তোমাকে কথা জানাতে চাই।

শহীদ দুলালের মা নাকি বলেছিলো সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন এ দেশের শিশুরা মা-বাবার কাছে বিস্কুট চকলেট না চেয়ে চাইবে পিস্তল-রিভলবার।

সেই মায়ের হৃদয়ের চাওয়াতো পূর্ণ হয়েছে স্বাধীনতার মাধ্যমে। মাগো, তুমি তাহলে আজ বলো না এমন এটা কথা যাতে আমাদের হলের এই স্বপ্ন পূরণ হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হাজারো মায়ের মধ্যে একজন মা যদি বলে, সেদিন বেশি দূরে নয়,যেদিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ হাজারেরও বেশি সন্তানেরা তাদের মাথা গোজার ঠাঁই পাবে। তাহলেই পূর্ণ হবে তোমার সন্তানদের হৃদয়ের চাওয়া।

আজ তোমাকে এই কথাগুলো লিখছে তোমার সেই সন্তান, যে খেলা করতে গিয়ে একটু ঘেমে গেলে তুমি ছুটে এসে আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে দিতে। এই আকুতি ভরা কথাগুলো লিখছে তোমার সেই সন্তান, যার একটু আরামে ঘুমানোর জন্য তুমি নিচে বিছানা করে তাকে শুয়েছো নরম তোষকে। আযানের সাথে সাথে যার খাবার মুখে তুলে দিতে মা।

আর আজ তুমি সেই সন্তানের উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তুমি তো নিশ্চিত মা আর মাতৃভূমি সমান ও সমান্তরাল। তোমার সন্তানকে তোমার মতো করে যত্নে রাখছে। মাগো! তুমি কি জানো তোমার সেই স্বপ্ন কতটুকু পূরণ হয়েছে?

এখন আর স্কুলে যাওয়ার মতো তোমার হাত ধরে যাই না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ধরতে ঘুমকাতুর সকালে উঠে লাইনে দাড়ায়। তুমিতো ভাবো বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি আছে,ছেলে আমার আরামে দোতলা গাড়িতে চড়ে। মা, আমি তো সেই গাড়ির দোতলা উঠার সিঁড়ির নিচে পত্রিকা বিছিয়েও যেতে পারিনি অনেক দিন। যে কদিনই বা সেখানে বসেছি তার একটু পরেই গাড়ির দরজাতে শুধু অনেক জোড়া পা দেখেছি। কালো অন্ধকার ঢেকে ফেলেছে আমাকে। আমার সামনে অনেকের যারা দাড়িয়ে ছিলো তাদের পা ভেদ করে একটু আলোও পৌছায়নি আমার কাছে। মনে হয়েছে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে না,যাচ্ছি কোন নিষিদ্ধ স্থানে। যেখানে শুধুই অন্ধকার। সত্যি বলছি গাড়ির দরজাতে বাদুরঝোলা তুমি দেখলে ভয় পেতে। পারিনি তোমার ছেলে স্বাভাবিক যাতায়াত করতে।

তুমিতো ভাবো তোমার ছেলে বড় বড় হলে থাকে। কোন চিন্তা নেই। কিন্তু সত্যিই তুমি এটাও জানো না যে, সেই ভাগ্যও আমাদের নেই বা হয়নি। দিতে পারিনি আমার মা নামক মাতৃভূমি। এত না পাওয়ার বেদনায় ভারাক্রান্ত হলেও মাতৃভূমি মা কে কিন্তু তাঁর সন্তানেরা জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে ভালোবেসে যাচ্ছে। যোগ্য করে তুলছে দেশ মাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করার জন্য। সেই মা কি কিছুই দিবে না তুমি বলো?

ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে বাড়ি ওয়ালাদের ছোট্ট খুপরিতে বা কোন এক চিলেকোঠাতে ঠাঁই। তুমি যদি জানতে তাহলে কষ্টে বুক চেপে ধরতে। তবে আজ বলছি তোমাকে এসব কথা। খুব কষ্ট হচ্ছে মা?? খাবারের কথা, চাকরি, টিউশনি তথা খরচের দায়ভার মেটানোর জন্য কি কি করি শুনবে তুমি? থাকা-খাওয়ার অনিশ্চয়তা তোমার ছেলের জীবন বড্ড ক্লান্ত। নরম তোষক তো দূরের কথা, শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই আর তিন বেলা খাবারের টাকা জোগাড় করার জন্য তাকে ছুটতে হয় টিউশনির দ্বারে দ্বারে। এভারে বড় ক্লান্ত তোমার ছেলে মাগো! টায়ারে জালানো আগুনের কথা তোমাকে প্রথমে বলেছি না? সেই আগুন আর কালো ধোঁয়ার যেমন সমন্বয় সেটাই হলো আমাদের কষ্টের রুপায়ন।

এখন তুমিই বলো এত কষ্ট,যন্ত্রণা, না পাওয়া অধিকারের বঞ্চনা আগুনরুপে ফুসে উঠতেই পারে। কি বলে তুমি সেটা ঠেকাবা বলো? তোমার সেই সন্তান আজ অনেক দিন ধরে রাস্তায় চিৎকার করছে অধিকারের স্বপ্নে। তাকে কি তুমি খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবে বলো? যদি না পারো তাহলে এবার বলো না তোমার সেই স্বপ্নের কথা।

সেদিন বেশি দূরে নয়,যেদিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০হাজারেরও বেশি সন্তানের তাদের মাথা গোজার ঠাঁই পাবে। পাবে তাদের স্বপ্নের হল। চারনেতার মতো মহাপুরুষের নামে করা সেই হলই হবে আমাদের ছাত্রজীবনের থাকার পরিচয়। এর মাধ্যম দিয়ে দূর হবে কি অজানা এই ঠিকানা সঙ্কট??

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

 


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print