বুধবার , ১৫ আগস্ট ২০১৮
মূলপাতা » খেলাধুলা » জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হোক মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হোক মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে

339271_236480196419913_1946501944_oমো. মিঠুন মিয়া
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। কার্যকর নেতৃত্ব ও সমন্বিত উদ্যোগের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস (এমডিজি) অর্জনে অনন্য সাফল্য দেখিয়েছে। জাতিসংঘ প্রণীত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি) বাস্তবায়নে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নেতৃত্বের আসনে এখন বাংলাদেশ। ঢাকা শহরকে রূপকল্প-২০২১ অনুযায়ী যানজট নিরসন করে একটি পরিকল্পিত নগরী হিসাবে গড়তে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধন ও যানজট নিরসনের ক্ষেত্রে বেশকিছু সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

এর অংশ হিসেবে রাজধানীতে যানজট নিরসনে এবং জনসাধারণকে দ্রুত ও উন্নত গণপরিবহন সেবা দেয়ার লক্ষ্যে বহুল প্রত্যাশিত মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয়েছে। এতে ঢাকাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে গেল।
এতো দিন আমরা বইপত্রে মেট্টোরেলের বিষয় পড়ে এসেছি, কিন্তু আজ চোখে দেখছি মেট্টোরেলের কাজ চলছে। নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের এবং বর্তমান সরকারের মেগা প্রকল্প হচ্ছে দেশের ইতিহাসে প্রথম এই মেট্টোরেল স্থাপনের উদ্যোগ। ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ নির্মিতব্য এই মেট্টোরেলের স্টেশন হবে ১৬টি। মেট্টোরেল উত্তরা থেকে পল্লবী, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, প্রেসক্লাব ও মতিঝিল পর্যন্ত যাবে। ভ্রমণ সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট। ঘন্টায় এই মেট্টোরেল প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী বহন করতে পারবে। আর এই মেট্টোরেল হচ্ছে জাইকার সহযোগিতায়। ২০১৯ সালের মধ্যেই এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। ঢাকার মতো বড় শহরে মেট্টোরেলের খুব প্রয়োজন ছিল। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশ্বমানে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে মেট্টোরেল চালু হলে যানজট কমে যাবে। একই সঙ্গে নিরাপদ, দ্রুত, ব্যয় সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও  আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি সমৃদ্ধ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ শিক্ষার অবাধ সম্ভাবনার দ্বার জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে ২০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। পুরান ঢাকার যানজট ও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার কল্যাণ চিন্তা করে জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীদেরকেও মেট্টোরেলের সুবিধার মধ্যে আনয়ণ করতে হবে। আর এজন্য প্রেসক্লাব থেকে মেট্টোরেলের একটি স্টেশন জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত করা কোনো কঠিন বিষয় নয়। জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয় থেকে মতিঝিল পর্যন্ত হোক মেট্টোরেল স্টেশন।

অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করে ভর্তি হলেও নানা সমস্যা আর সংকটের মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন পার করছেন সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এখানে নেই আবাসন সুবিধা। রয়েছে পরিবহন সংকট, সমৃদ্ধ নয় গ্রন্থাগার ও সেমিনার কক্ষ, স্বল্প শ্রেণীকক্ষে চলে পাঠদান।  দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন বছর চেষ্টা করেও কয়েকশ’ কোটি টাকার সম্পত্তি এবং আবাসিক হলগুলোর দখলমুক্ত করতে পারেনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ফলে আবাসন-সুবিধাবঞ্চিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শিগগিরই হলের ব্যবস্থা করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসন-সুবিধা না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই ঢাকার শহরের বিভিন্ন এলাকায় মেস বা বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। অনেকে আবার ক্যাম্পাসের আশপাশে থাকার জায়গা না পেয়ে চলে যাচ্ছেন ঢাকার বাইরে। এক্ষেত্রে মেট্টোরেলের সুবিধা তাদের শিক্ষা জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

রাজধানীর অন্য এলাকার চেয়ে একটু ভিন্ন চিত্র দেখা যায় পুরান ঢাকার যানজটের ক্ষেত্রে। পুরান ঢাকার রাস্তায় বাস, প্রাইভেট কার, রিকশা, ভ্যানসহ নানা রকমের গাড়ির সমারোহ। দেখলে মনে হয় পুরো ঢাকা শহরের গাড়ি বুঝি গুলিস্তান থেকে সদরঘাট ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে এসে জড়ো হয়েছে।  গাড়িগুলো পার্কিং করে রাখা, না রাস্তা দিয়ে চলমান তা বোঝার কোনো উপায় থাকে না। পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার থেকে নয়াবাজার মোড়ে হেঁটে যেতে সময় লাগে মাত্র তিন মিনিট। কিন্তু গাড়িতে যেতে সময় লাগে কমপক্ষে ৩০ মিনিট। একই রকম সময় অপচয় হয় নারিন্দা থেকে রায়সাহেব বাজার মোড়ে যেতে। ওই দুই সড়কের মতো পুরান ঢাকার আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের একই অবস্থা। বিশেষ করে সদরঘাটের ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকা থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ অবস্থা। পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকা থেকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে গুলিস্তান যেতে। সব সড়কেই চলছে রিকশা। এ ছাড়া অনেক সড়কের দুই পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। সড়কের দুই পাশে ফুটপাত ও গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে প্রতিদিনই ওই এলাকায় যানজট লেগে থাকে।

যানজট নিরসন এবং স্বাচ্ছন্দ নাগরিক জীবন নিশ্চিত করাই যদি মেট্টোরেলের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সবার আগে বিবেচনায় আনতে হবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরান ঢাকাবাসীকে। পুরান ঢাকার ভয়াবহ এই যানজট পেড়িয়ে শিক্ষাজীবন পার করতে হচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরকে। দিনের একটি বড় সময় যানজটে পড়ে তাদের জীবন থেকে অপচয় হচ্ছে। শিক্ষা জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, এই যানজট পেড়িয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসতে একজন শিক্ষার্থীদের কতটা দুর্ভোগের শিকার হতে হয়, তা বলে বোঝানো যাবে না। পুরান ঢাকার এই যানজট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অভিশাপ স্বরূপ। যে সময় তারা শিক্ষার জন্য ব্যয় করবে কিন্তু সে সময় নষ্ট হচ্ছে যানবাহনে বসে। আবাসিক এবং যানবহন সংকটে তাদের শিক্ষা জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কেবল শিক্ষার্থীরা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষকরাও।

এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে এই মেট্টোরেলের সুবিধার মধ্যে আনতেই হবে। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি সুফল পাবেন পুরান ঢাকাবাসী। এছাড়া পুরান ঢাকায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রবেশদ্বার সদরঘাট। রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পুরান ঢাকা পর্যন্ত মেট্টোরেল করা হলে জেলা দায়রা জজ আদালত, ঢাকা জেলা পরিষদ, বাংলাদেশ ব্যাংক (সদরঘাট শাখা), ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড হাসপাতাল, সদরঘাট টার্মিনাল, কবি নজরুল, সোহরাওয়ার্দী কলেজসহ অনেক শিক্ষা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সুবিধা পাবে। যানজটে বসে আর লঞ্চ ধরার তাড়া করতে হবে না ঘরমুখী মানুষকে। কমে যাবে ওই এলাকার যানজট। সুফল মিলবে নাগরিক জীবনের।

টেকসই উন্নয়ন এমন হওয়া উচিত যা সবার কল্যাণ বয়ে আনে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় বরং তারাও সুফল ভোগ করে। সমাজের সকল শ্রেণীর আগে শিক্ষার্থীদেরকে আগে প্রাধান্য দিতে হবে। কেননা তারাই তো দেশের ভবিষ্যৎ। তারা সুষ্ঠু সুন্দর এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠলে দেশেরই মঙ্গল হবে। কারণ তারাই তো এক সময় দেশের হাল ধরবে। তাদের শিক্ষা কার্যক্রম আরো গতিশীল এবং মঙ্গলজনক হয়- এবিষয় অবশ্য সরকারকেই নজরে রাখতে হবে। এজন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে মেট্টোরেলের সুবিধার আওতায় আনতে সকল ব্যবস্থা করতেই হবে। রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধাকদের প্রতি উদ্ধাত্ত আহ্বান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে মেট্টোরেলের আওতায় আনুন।

অনাবাসিক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্তত যাতায়াতের সুবিধার বিষয় নজরে এনে মেট্টোরেলের ১৬টি স্টেশন থেকে একটি স্টেশন বেশি করা খুব একটা কষ্টসাধ্য বিষয় নয়। এর জন্য যে ব্যয় হবে তার চেয়ে সুফলই বেশিই হবে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে জগন্নাথ বিশ্বেবিদ্যালয়ের ২০ হাজার শিক্ষার্থী। শাহবাগ থেকে মেট্টোরেলের একটি স্টেশন হবে জাতীয় প্রেসক্লাবে। এই প্রেসক্লাব থেকে একটি স্টেশন করতে হবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। যেহেতু ভিক্টোরিয়া পার্ক পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্র, তাই ওই এলাকার সাথে মেট্টোরেল যুক্ত হলে আরো ভালো হয়। জগন্নাথ বিশ্বব্যিালয় থেকে স্টেশন হোক ব্যাংক এলাকা মতিঝিল পর্যন্ত। যেহেতু আবাসন সুবিধা বঞ্চিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কাজেই এই মেট্টোরেলের সুবিধা শিক্ষার্থীদের জীবনে আশার সঞ্চার করবে। শিক্ষার্থীরা অতি সহজে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে পারবেন। মূল্যবান সময় অপচয় রোধ এবং যাতায়াত খরচও কম হবে। মোটকথা খুবই উপকৃত হবেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং পুরান ঢাকাবাসী।

বর্তমান সরকার জনকল্যাণে নিয়োজিত সরকার। উন্নয়নের সেবা সকলের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে দৃঢ় পরিকর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শিক্ষা খাতে এই সরকারের অবদান আকাশচুম্বী। যথাযথ শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এই সরকার দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করছে শিক্ষকদের সমস্যাসহ নানা সংকট। কাজেই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সর্বাগ্রে বিবেচনা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালকে মেট্টোরেলের সুবিধার মধ্যে আনতে সরকার সকল করণীয় ঠিক করবে। এজন্য সকল বাধা অন্তরায় পেড়িয়ে সর্বোচ্চ উদার মনমানসিকতার পরিচয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে মেট্টোরেলের সুবিধার সাথে যুক্ত করবেন – এমনটি প্রত্যাশা।

লেখক 

সাংবাদিক ও সাবেক শিক্ষার্থী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print