মঙ্গলবার , ১৪ আগস্ট ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » নকশায় ত্রুটি রেখেই বাড়ছে নির্মাণ ব্যয়

নকশায় ত্রুটি রেখেই বাড়ছে নির্মাণ ব্যয়

বাংলাদেশে সব ধরনের মোটরযান ডান হাতে চালিত। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নির্মাণ করা হয় বিভিন্ন অবকাঠামো। নকশাও প্রণয়ন করা হয় সে আদলেই। তবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারটির নকশা করা হয়েছে বাম হাতে চালিত গাড়ির কথা মাথায় রেখে। আর এ ত্রুটি না সারিয়েই নির্মাণ করা হচ্ছে এটি। সংশোধন করা হয়নি নকশাও। অথচ নকশা সংশোধনের যুক্তিতে নির্মাণ ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে ৪৪৬ কোটি টাকা।

এরই মধ্যে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার (সমন্বিত) উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটির সংশোধন প্রস্তাব আগামীকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।

প্রাথমিকভাবে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে সংশোধীMOgbazar flyoverত প্রস্তাবে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে ব্যয় বাড়ছে ৪৪৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৮ শতাংশ। এ প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকার দেবে ৪৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বাকি ৭৭৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা আসবে প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে।

২০১১ সালে ফ্লাইওভারটির নির্মাণকাজ শুরু হয়, যা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা না হওয়ায় বাড়ানো হচ্ছে বাস্তবায়নকাল, প্রকল্প সংশোধন প্রস্তাবে যা ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্মাণকাজের এ ধীরগতির কারণে আরো দেড় বছর নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানোর পেছনে একগুচ্ছ কারণ দেখিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মাটির নিচের বিভিন্ন পরিষেবা সংযোগ লাইনকে। সংস্থাটির মতে, ফ্লাইওভারটির নকশা করার সময় প্রকল্প এলাকায় মাটির নিচে থাকা বিভিন্ন পরিষেবা সংযোগ লাইন সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল না। ফলে বাস্তবায়নের সময় ওইসব সংযোগ এড়াতে গিয়ে ফ্লাইওভারের পাইলিংয়ের স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। আর ফ্লাইওভারটিকে যথাযথ ব্যবহার উপযোগী করার জন্য নতুন কিছু অংশ যুক্ত করা হয়েছে। এসব কারণে নকশায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হিসেবে ফ্লাইওভারের র্যাম্পটিকে এফডিসির পরিবর্তে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত বর্ধিত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্পের পরিচালক নাজমুল আলম বলেন, ফ্লাইওভারের নশকায় পরিবর্তন হয়েছে, দৈর্ঘ্যও বেড়েছে। এতে ব্যয় বাড়ছে। এছাড়া নতুন বেশকিছু উপাদান যুক্ত হয়েছে। এতে ব্যয় বাড়তেই পারে।

তবে এ যুক্তি ঠিক নয় বলে মনে করছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ফ্লাইওভারের পাইলের অবস্থান পরিবর্তনের ফলে ৯২ কোটি ১৯ লাখ, পট বেয়ারিং অ্যান্ড শক ট্রান্সমিশনে ৪৬ কোটি ৭৮ লাখ ও র্যাম্প সম্প্রসারণে ৮৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় হবে। আর বাস্তবায়ন বিলম্বে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২৩১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নকশায় ত্রুটি সংশোধনের যুক্তিতে বাড়ানো হচ্ছে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নির্মাণ ব্যয়। তবে বাম হাতে চালিত মোটরযানের বিষয়টি আর সংশোধন করা হয়নি। কারণ এরই মধ্যে ত্রুটিপূর্ণভাবে ৬০টি পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ফ্লাইওভারে ওঠার র্যাম্পগুলো বেশি খাড়া, অথচ নামার র্যাম্পগুলো তুলনামূলক বিস্তৃত। নকশা সংশোধনে এক্ষেত্রে ৬০টি পিলারই ভাঙতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লাইওভারে ওঠার রাস্তা বেশি ঢালু হয়, যাতে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালিয়েই ওঠা যায়। আর নামার রাস্তাটি হয় তুলনামূলক খাড়া। ফলে গতি কমিয়ে দ্রুত ফ্লাইওভার থেকে নামা যায়। এতে ফ্লাইওভারে ওঠার র্যাম্পটির দৈর্ঘ্য বেশি ও নামার র্যাম্পের দৈর্ঘ্য থাকে কম।

তবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সাতরাস্তা, মগবাজার, মালিবাগ, রাজারবাগ, পুলিশ লাইন, শান্তিনগরসহ প্রতিটি এলাকায় ওঠার র্যাম্প অনেক বেশি খাড়া। এজন্য এগুলোর দৈর্ঘ্যও রয়েছে কম। আর নামার র্যাম্পগুলো তুলনামূলক বেশি ঢালু। ফলে এগুলোর দৈর্ঘ্যও বড় রাখা হয়েছে। এতে বাম হাতে চালিত যানের জন্য নির্মিতব্য এ ফ্লাইওভার ডান হাতে চালিত যানের জন্য ব্যবহার করতে হবে।

এ বিষয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব জানান, জবাবদিহিতার বাইরে গিয়ে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ সামগ্রিকভাবে মঙ্গল বয়ে আনবে না। মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নকশার ত্রুটি মহাখালী ফ্লাইওভারের ক্ষেত্রেও ছিল। মহাখালী ফ্লাইওভার তৈরির ফলে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত সচল ডাইভারশন তৈরি করা যায়নি। বরং মহাখালী ফ্লাইওভারের কার্যকারিতা বাড়াতে তেজগাঁও শিল্প এলাকার দিকে একটা উইং দরকার ছিল, যা করা যায়নি। একইভাবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার বাম ও ডান সাইডের মাধ্যমে এক প্রকার অকার্যকর করে নির্মাণ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ২০০৩ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নকশা প্রণয়ন করে। সে নকশার ভিত্তিতেই ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ফ্লাইওভারের নকশা ত্রুটির এটিই মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মোটরযানের সম্পূর্ণটাই বাম হাতে চালিত। তাই সে দেশের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়ায় মূলত নকশায় ত্রুটি দেখা দিয়েছে। আর এলজিইডি গ্রামগঞ্জে সড়ক নির্মাণ করে। শহরে ফ্লাইওভার নির্মাণের কোনো ধরনেরই অভিজ্ঞতা তাদের নেই। ফলে নকশা প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্টরা ত্রুটি চিহ্নিতই করতে পারেননি।

এদিকে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে শান্তিনগর ছাড়া অন্য কোনো স্থানে ডানে মোড় নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ তিন তলাবিশিষ্ট ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলেও মগবাজার, বিশ্বরোড ইন্টারসেকশন ও টঙ্গী ডাইভারশন রোডে ওঠার কোনো র্যাম্প রাখা হয়নি। এতে ফ্লাইওভারে যানবাহনের সংখ্যা কমে যাবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ফ্লাইওভারটির নকশায় কারিগরি কিছু ত্রুটি আছে। কারণ শহরের মধ্যে ডানে মোড় নেয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় এ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এতে যে পরিমাণ গাড়ি ফ্লাইওভার ব্যবহার করার কথা, তার চেয়ে অনেক কম চলাচল করবে।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print