বুধবার , ২৫ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » সরকারি » উন্নয়নের ব্যানারে রেলওয়ের লস প্রজেক্ট!

উন্নয়নের ব্যানারে রেলওয়ের লস প্রজেক্ট!

2016_01_02_12_24_40_tG66OzLykdKJ1k5oYhFMwHlkvqk87a_originalখাদ্যভবন ও শিক্ষা ভবনের বিপরীতে আব্দুল গনি রোডে রেলভবনের গেট দিয়ে ঢুকলেই চোখে পরবে এসব ব্যানার। মূল রাস্তার গেট থেকে শুরু করে আইজিআর ( ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্টার) অফিস পর্যন্ত বড় বড় সাইজের ব্যানার উচু করে টানানো হয়েছে। এছাড়া রেলভবনের নীচতলা পুরো দেয়ালেই সাটানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ছবিসহ নানা উন্নয়নমূলক ব্যানার। এমনকি লিফটে পর্যন্ত সাটানো আছে ব্যানার ও পোস্টার।

বলা যায়, উন্নয়নের ব্যানারে রীতিমতো হাবু-ডুবু খাচ্ছে ভবনটি। বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন, রেল উন্নয়নের বর্তমান সরকারের সাফল্য, নতুন ট্রেন লাইন চালু, ফরিদপুর-পাচুরিয়া রেল লাইনে ট্রেন চলাচলের শুভ উদ্বোধনসহ নানা উন্নয়নের ব্যানার টানানোর কারণে একরকম অবরুদ্ধ হয়ে আছে পুরো রেলভবন। রেলপথ মন্ত্রী ও এক শ্রেণির রেল কর্মকর্তাদের সহায়তায় ব্যানারগুলো টাঙিয়েছেন সরকার দলীয় লোকেরা। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা!

শুধু ব্যানারই শেষ নয়, এভাবে অপরিকল্পিত একের পর এক প্রকল্পে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় দেখিয়ে রেলেওয়ের লসের পাল্লা ভারি করে রাখা হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, যেখানে যেটা প্রয়োজন নয়, সেখানে সেটা করা হচ্ছে। ৮ তলা ভবনের দুটি লিফ্ট থাকার পরও আরো দু’টি লিফ্ট লাগানো হয়েছে। মোজাইক করা রেল ভবনের প্রথম ফ্লোর ভেঙে বসানো হয়েছে টাইলস।

সাবেক মহাপরিচালক টিএ চৌধুরীর আমলে মহাপরিচালকে কক্ষ ছিল কারপেটে ঢাকা। পরবর্তী মহাপরিচালক এসে কারপেট উঠিয়ে নতুন আঙ্গিকে বসানো হয়েছে টাইলস। পরবর্তী মহাপরিচালক এসে পুরানো চেয়ার ফেলে নতুন চেয়ার আনা হয়েছে। তার পিএস এর রুমকে পর্যন্ত সংস্কার করা হয়েছে। পিএস এর রুম সংস্কারের নামে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০ লাখ।

এভাবে শুধু মহাপরিচালকের কক্ষ নয়। পুরো ভবনের অন্যান্য কর্মকতাদের কক্ষও নতুন ভাবে সংস্কারের নামে বছর বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হচ্ছে।  অথচ রেল যাত্রীসেবার মান ২০ বছর আগেও যা ছিল এখনও চাই রয়েছে। নূন্যতম যাত্রীসেবার মান উন্নতি হয়নি। যার ফলে রেলের প্রতিবছর লোকসানের পাল্লা ভাড়ি হচ্ছে।

জানা গেছে, ১৯৬৯-১৯৭০ সালে ৫ কোটি ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আয় করেছে রেল বিভাগ। এরপর আর কোনো বছরই রেলে আয় বাড়েনি। বেড়েছে শুধু ব্যয়। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৯ কোটি ৪৬ লাখ ১৬ হাজার। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণে এসে ৫১৫ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাঁড়ায়। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৪৮০ কোটি ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৫২৬ কোটি ৯০ লাখ ১৬ হাজার, ২০০৮-০৯ অর্থবছওে ৫৪৭ কোটি ৩৯ লাখ ৬৬ হাজার, ২০০৯-১০ অর্থবছওে ৬৯০ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৮৬২ কোটি ২৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা থেকে ব্যয় হয়েছে।

২০১১ সালে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠনের পরও ২০১১-১২ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৯৯৩ কোটি ৬৮ লাখ ৬৩ হাজার, ২০১২-১৩ সালে ৭৫৮ কোটি ১১ লাখ ৮৮ হাজার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০১ কোটি ৫১ হাজার ৬৮ হাজার টাকা।

এ ব্যাপারে রেলওয়ের অডিট আপত্তিতেও এসব ব্যয়ের তথ্য উঠে এসছে। তবে রেলওয়ে অডিট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো অডিটের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এজন্য অডিট প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। তার অনুমোদনের পর সংসদেও এগুলো উত্থাপন করা হবে। তখন সারা দেশের মানুষ এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে জানতে পারবে।’

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ সংস্কার করা হয়। প্রকল্পটির আওতায় ৭৫ পাউন্ডের ১ লাখ ৪০ হাজার ২৮ ফুট রেলপাত কেনা হয়। কিন্তু ব্যবহার হয় ১ লাখ ২৬ হাজার ৮১৬ ফুট। ১৩ হাজার ২১২ ফুট রেলপাত অব্যবহৃত থেকে যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকার পাত এখনো ঢাকা-নারায়নগঞ্জ রেল লাইনের পাশে বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে।

২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে নতুন রেলপথ নির্মাণ ও পুরনো রেলপথ সংস্কারে এভাবেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা হয় স্লিপার, রেলপাত, ক্লিপ। সে সময় ইঞ্জিন মেরামতেও বিভিন্ন উপকরণ কেনা হয় চাহিদার অতিরিক্ত। পাঁচ বছরেও ১২৬ কোটি টাকার এসব সামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি। বরং বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা এসব সামগ্রী প্রায়ই চুরি হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাস্তব অবস্থা ও চাহিদা নিরূপণ না করেই বিভিন্ন প্রকল্পের উপকরণ কিনেছে রেলওয়ে। এতে অব্যবহৃত থেকে গেছে প্রকল্প সামগ্রী। অনেক সময় এগুলো উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা হয়েছে। আবার বেঁচে যাওয়া অতিরিক্ত সামগ্রী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফেরত নেয়া হয়নি। এভাবে সরকারের অর্থ ও সম্পদের অপচয় করা হচ্ছে।

২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে রেলওয়ের ৪৫টি লোকোমোটিভ পুনর্বাসন (বড় ধরনের মেরামত) করা হয়। তবে প্রকল্পটির আওতায় বাস্তব চাহিদা নিরূপণ না করে ৬০টির বেশি উপকরণ। ফলে প্রকল্পটির আওতায় অপ্রয়োজনীয় কেনা ৮ কোটি টাকার বেশি সামগ্রী এখনো অব্যবহৃত পড়ে আছে। এর মধ্যে ৬০টি উপকরণ কেনায় অপচয় হয় ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বিনকার্ড, লেজারকার্ড অতিরিক্ত কিনে অপচয় করা হয় ১ কোটি ১২ লাখ টাকা।

লোকোমোটিভের ধরন পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় এসব সামগ্রী ভবিষ্যতে আর ব্যবহারের সম্ভাবনাও নেই। ইঞ্জিনগুলোয় ক্ষয়প্রাপ্ত চাকা পুনস্থাপনে ৩৬ ইঞ্চির ৩০৪টি চাকা কেনা হয়। এর মধ্যে ২৮৪টি ব্যবহার হয়নি। এতে ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকার চাকা অব্যবহৃত পড়ে আছে ৫ বছর ধরে। এছাড়া ৬ হাজার ২০০ মডেলের মিটারগেজ লোকোমোটিভে সংশোধনে কেনা হয় ১টি স্ট্যাটর অ্যাসেম্বলি। এতে ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও সেটি আর প্রয়োজন হয়নি।

একইভাবে লোকোমোটিভে সংযোজনের জন্য ৩৩ ইঞ্চির ১৪১টি ডায়া কেনা হয় ৭৮ লাখ টাকায়। সেগুলো এখনো অব্যবহৃত পড়ে আছে। আর ৪০ ইঞ্চির ১৪০টি চাকার অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এতে অপচয় হয় ৮৫ লাখ টাকা। আর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় মজুদ থাকার পরও ২০১০-১১ অর্থবছর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কেনা হয়। এগুলো ব্যবহার না হওয়ায় ২ কোটি টাকা অপচয় হয়।

একই অবস্থা অন্যান্য প্রকল্পেরও। ২০১০-১১ অর্থবছরে লালমনিরহাট দফতরের আওতায় লাইন মেরামতে রাজশাহী থেকে ৫ হাজার মিটার গেজ স্টিল স্লিপার সরবরাহ নেয়া হয়, যার কোনো ব্যবহারই হয়নি। এতে অপচয় হয় ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। আর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের আওতায় কেনা রাজস্ব খাত থেকে কেনা হয় ১২ হাজার ৩৮০টি কাঠের স্লিপার। এগুলো খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখায় নষ্ট হয়ে যায়। এতে অপচয় হয় ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

পড়ে থাকা রেলপাত

৯৯ সেট পয়েন্টস অ্যান্ড ক্রসিং তৈরিতে ৮৯১টি ৭৫ পাউন্ডের নতুন রেল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করে রেলওয়ে। এগুলোর ওজন ছিল ৪২৪ টন। তবে এর পুরোটাই ব্যবহার হয়নি। কাজ শেষে ১০২ টন কাটপিস রেল অব্যবহৃত থাকলেও তা ফেরত নেয়া হয়নি। এতে অপচয় হত ৪৬ লাখ টাকা। আর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ সংস্কারে অব্যবহৃত ১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের নির্মাণ সামগ্রী ফেরত নেয়া হয়নি।

শুধু অপ্রয়োজনীয় কেনাটাকাই নয়, অনেক সময় নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে কেনা হয় নির্মাণ সামগ্রী। এর মধ্যে পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের জন্য কেনা ১৯টি আইটেম শতভাগ বেশি দামে কেনা হয়। আর মোটর ফুয়েল অয়েল বুস্টার পাম্প কেনা হয় ১৬৫ শতাংশ বেশি দামে। এতে ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা অপচয় হয়।

এ ব্যাপারে কথা বলতে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেনের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোন স্বাক্ষাৎ দেননি। তবে তার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে অডিট অধিদপ্তর না বুঝেই অভিযোগ উত্থাপন করে। এরই মধ্যে কয়েকটির উত্তর দেয়া হয়েছে। সেগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সব সময়ই প্রয়োজন অনুপাতে নির্মাণ সামগ্রী বা উপকরণ কেনা যায় না।’ অডিট আপত্তি পুরোপুরি ঠিক না হলেও বেশীর ভাগই সঠিক বলেও স্বীকার করেন তিনি।

রেলপথ মন্ত্রী মো. মুজিবুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘রেল সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। আয় করার জন্য নয়। যাত্রী সেবাই আমাদের মূল লক্ষ্য। বর্তমান সরকার রেল উন্নয়নে ৪৫টি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে অনেকগুলোরই কাজ শেষ হয়েছে। অনেকগুলো চলমান রয়েছে।’ বাকী প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে রেলের আমুল পরিবর্তন ঘটবে বলে তিনি মনে করেন।

সূত্র: বাংলামেইল টোয়েন্টিফোর ডট কম।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print