রবিবার , ২৪ জুন ২০১৮
মূলপাতা » অন্যান্য » দালাল ঠেকাতে কড়া হুঁশিয়ারি : নড়েচড়ে বসছে উকিল সহকারীরা

দালাল ঠেকাতে কড়া হুঁশিয়ারি : নড়েচড়ে বসছে উকিল সহকারীরা

high_cortস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পরিচয় নিশ্চিত করতে আইনজীবী সহকারী ও ক্লার্কদের কড়া হুঁশিয়ারি করে নোটিশ দিয়েছে সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ও হাইকোর্ট কর্তৃপক্ষ। এতে করে এতদিন ঢিলেমি করে কাটালেও এবার বেশ নড়েচড়ে বসেছে সুপ্রিমকোর্ট বারের আইনজীবী সহকারীরা। এ সিদ্ধান্ত আইনি সহায়তা নিতে আসা মানুষের উপকারে আসবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে এবং টাউট, বাটপার ও দালাল এড়াতে সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং কোর্ট কর্তৃপক্ষ শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে তারা আদালত ও বার অ্যাসোসিয়েশেন ভবনের বিভিন্ন জায়গায় নোটিশ ঝুলিয়েও দিয়েছেন। সুপ্রিমকোর্ট বারের পক্ষে নোটিশে স্বাক্ষর করেছেন বারের সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ও হাইকোর্ট কর্তৃপক্ষে স্বাক্ষর করেছেন সহকারী রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) সোহাগ রঞ্জন পাল।

সুপ্রিমকোর্ট বার তাদের নোটিশে লেখা হয়েছে, আইনজীবী সহকারীরা তাদের নির্ধারিত পোষাক, আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে আদালত প্রাঙ্গনে প্রবেশ করবে। যদি এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ যদি আদালত প্রাঙ্গনে প্রবেশ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উচ্চ আদালত কর্তৃপক্ষ তাদের নোটিশে লিখেছেন, সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় কোনো আইনজীবী সহকারী তাদের নির্ধারিত পোষাক, আইডি কার্ড ব্যতিত আদালত অঙ্গনে প্রবেশ করতে পারবে না। যদি কেউ এ নিয়ম লঙ্ঘন করে ভেতরে প্রবেশ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উক্ত নোটিশের কপি সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগন, কোর্ট অফিসার, কোর্ট কিপার, সুপারিনটেডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট শাখায়ও পাঠানো হয়েছে।

এর আগে সুপ্রিমকোর্টের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা চেয়ে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে একটি আবেদনও করা হয়েছিল বিভিন্ন দপ্তরে। সে আবেদনের কপি অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার, ঢাকা মহানগর পুলিশ ও শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর পাঠানো হয়েছিল। সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এটি করেছিলেন। সেই আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে যারা জুনিয়র হিসেবে কাজ করবেন  তাদের বার কর্তৃক ইস্যুকৃত ব্যাজ ও পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে। পরিচয়পত্র ব্যতীত কোনো জুনিয়র আইনজীবী এবং লাইসেন্সবিহীন কোনো ক্লার্ক যেন আদালত অঙ্গনে প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ বাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্ট বারের সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন বাংলামেইলকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে আমরা এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আদালত প্রাঙ্গনে অনেক বিচারপ্রার্থীর কাছ থেকে ভুয়া ক্লার্ক সেজে, আইনজীবী সেজে, মামলা গ্রহন করছে। এতে করে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা অনেক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি সুপ্রিমকোর্ট বারের সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই উচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভুয়া ক্লার্ক ও ভুয়া আইনজীবীদের এখানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছি। ইতোমধ্যে একজন ভুয়া আইনজীবীকে আদালত প্রাঙ্গনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।’ এ পদক্ষেপে আদালতের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিচার প্রার্থীদের হয়রানি বন্ধে অনেক উপকারে আসবে জানান এই আইনজীবী নেতা।

সরেজমিনে জানা যায়, অনেক টাউট, বাটপার, দালাল, ভুয়া আইনজীবী সেজে, ভুয়া ক্লার্ক সেজে মামলা পরিচালনা করে কোটিপতি হয়েছেন। তারা বাগিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। রাজধানীতে করেছেন বিলাসবহুল বাড়ী, গাড়ীসহ অনেক সম্পদ।

অথচ তাদের কারোই আইনজীবী সহকারী বা আইনজীবী সনদ নেই। এই ভুয়া আইনজীবী ও ভূয়া ক্লার্করা বিভিন্ন জাতীয় উৎসব ও ঈদকে সামনে রেখে বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে জামিন করিয়ে দেয়ার কথা বলে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন সাধারণ বিচারপ্রার্থী ও আদালত অঙ্গনের মানুষেরা।

জানতে চাইলে আইনজীবী সহকারী সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. নুর মিয়া বাংলামেইলকে বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে আইনজীবী সহকারীদের আইডি কার্ড নেয়ার জন্য সুপ্রিমকোর্ট বার তাগিদ দিচ্ছে। আমরাও এ নিয়মের প্রতি সম্মান জানিয়ে একমত পোষণ করেছি। ক্লার্ক পরিচয় দিয়ে বাহির থেকে বিভিন্ন লোক আদালতের ভিতরে এসে কাজ করছে। তারা ক্লার্ক পরিচয় দিয়ে বড় বড় মামলার তদবির করছে। হাতিয়ে নিচ্চে কোটি কোটি টাকা। তাদের জন্য প্রকৃত আইনজীবী সহকারীদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে। এজন্য এ নিয়ম করা হয়েছে।’

নুর মিয়া বলেন, ‘অনেকেই বাইরে থেকে এসে আদালতের আদেশের কপি ও সার্টিফাইড কপি নকল করে বিচারপ্রার্থী ও আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এজন্য সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন তাদের চিহ্নিত করতে পরিচয়পত্র দিচ্ছে।
বিষয়টি মাথায় রেখে ইতোমধ্যে সুপ্রিমকোর্ট বার এসোসিয়েশন ও আদালত কর্তৃপক্ষ ভুয়া ক্লার্ক ও ভুয়া আইনজীবী তাড়াতে এবং আদালতের ভাবমূর্তি রক্ষাতে নোটিশ দেয়ায় আইডি কার্ড ও পরিচয় পত্র পেতে বারের কার্যালয়ে ভিড় করছেন আইডি কার্ডহীন অনেক আইনজীবী সহকারী।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্ট বারের সুপারিনটেনন্টে নিমেশ চন্দ্র দাশ বাংলামেইলকে বলেন, ‘নোটিশের পর আইনজীবী সহকারীরা তাদের নিবন্ধন পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আইনজীবী সহকারীরা তাদের পরিচয় পত্রের জন্য আমাদের কাছে আবেদন করছেন।’

আগামী শনিবার সুপ্রিমকোর্ট বারের কার্যনির্বাহী কমিটি নতুন দরখাস্তকারীদের ইন্টারভিউ নিবেন জানিয়ে নিমেশ বলেন, ‘আমরা তাদের আবেদন গ্রহণ করছি, সেগুলো যথাযথ হলে আমরা বিবেচনা করবো। বিগত দিনে এ ব্যাপারে কোনো নোটিশ না দেয়ার কারণে অনেকেই আইডি ছাড়াই এখানে কাজ করে গেছেন। এখন আর সেই সুযোগ নেই।’

ইন্টারভিউ নিয়ে কতজনকে আইডি কার্ড প্রদান করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে নিমেশ বলেন, ‘সেটি বার অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত। তারা ইচ্ছা করলে ফিফটি অথবা একশ পার্সেন্টও নিতে পারেন। পরিচয়পত্র দেয়ার জন্য দরখাস্তকারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা সমমান পাশের সার্টিফিকেট, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, তিনি যে অ্যাডভোকেটের সহকারী বা ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতে চান তার সনদ, সুপারিশ লাগবে।’

একজন উকিল কতজন সহকারীর পক্ষে সনদ ও সুপারিশ দিতে পারবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একজন উকিল দুজনের সুপারিশ করতে পারবেন।’ সুপ্রিমকোর্টে এ পর্যন্ত দেড় হাজার ক্লার্ককে আইডি কার্ড প্রদান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিমেশ চন্দ্র দাশ। এরমধ্যে ১২শ সহকারী নিয়মিত ভাবে কাজ করেন এখানে, বাকীরা কেউ অ্যাডভোকেট বা অন্য পেশায় চলে গেছেন।

এ যাবৎ কোনো ভুয়া আইনজীবী সহকারী গ্রেপ্তার বা অ্যারেস্ট করতে পেরেছেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা অনেককেই সতর্ক করে দিচ্ছি, কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করিনি। তবে এবারের নোটিশের পর কেউ আইডি কার্ড ছাড়া কোর্ট অঙ্গনে প্রবেশ করে তবে তাকে ধরে পুলিশে হাতে সোপর্দ করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print