শুক্রবার , ২৭ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » খেলাধুলা » প্রসঙ্গ: নারী ক্ষমতায়ন

প্রসঙ্গ: নারী ক্ষমতায়ন

 

শারমিন আখতার

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি নারীর ক্ষমতায়ন। আলোচনার কেন্দ্রের এ প্রত্যয়টি সামাজিক উন্নয়নের সূচক বলে বিবেচিত। কেবল মানবেতর অবস্থা থেকে নারীর মুক্তি বা নারী অবস্থার উন্নয়নের জন্যই নয়, বরং সামাজিকভাবে নারীর সকল সমস্যার সমাধানে প্রধান ও প্রথম ধাপ হিসাবে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরিসরের পাশাপাশি  বাংলাদেশেও স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পরিসরে যে কোনো নীতি নির্ধারনী আলোচনায় বা সমস্যা সমাধানে নারীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।  কিন্তু আদতেই কি নারী ক্ষমতায়িত হচ্ছে? পুরুষতান্ত্রিক ধারা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, ও এর সপক্ষে রচিত আইন কানুন, ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি, আধুনিকায়ন উন্নয়ন কৌশলের অনুসরণ প্রভৃতি যেখানে বলবৎ, সেখানে নারী ক্ষমতায়ন কি পরিহাস নয়?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে নারী উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়ণের প্রেক্ষাপট থেকে ঘুরে আসি।

১৯৬০ ‍এর দশকে বিশ্বে ‘উন্নয়ন’ ধারণা প্র্বর্তন হয় যার মূল বিষয় ছিল মানবিক অবস্থার আপাত উন্নয়ন। এরপর ১৯৮০ এর দশকে উদ্ভুত হয় টেকসই উন্নয়নের ধারণা‍।এসময় মানবসম্পদের উন্নয়নের সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে আসে নারীর উন্নয়ন। দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলগুলোতে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্ব দেয়া হয়-  সমন্বিত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ও সচতেনতা বৃদ্ধি।

সমন্বিত উন্নয়ন তত্ত্বের মূল র্দশন হলো, পরিবার ও সামাজিক সমাজের উন্নয়ন তথা মানবসম্পদ উন্নয়নের চাবিকাঠি হলো নারী উন্নয়ন।

ডেভেলেপমেন্ট অল্টারনেটিভ উইথ উইমেন ফর নিউ ইরা (ডিএ ডব্লউি এন) নারীর ক্ষমতায়নের সংজ্ঞায় বলেছে  -‘এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জেন্ডার বৈষম্যহীন এক পৃথিবী গড়ে তোলা। যে পৃথিবীতে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারী তার নিজের জীবনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম।’

পশ্চিমা বিশ্বের বোদ্ধাগণ তাদের এই ধারণায়ন ফলে চিহ্নিত কিছু অঞ্চলকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে আর্থিক সহায়তা বরাদ্দ করা হলো। এই উছিলায় সূচনা হয় নব্য উপনিবেশবাদের। দারিদ্র্যতা হ্রাস কিংবা নিরসন, নারী ক্ষমতায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরন ইত্যাদি বহুমুখী উন্নয়নের জন্য আর্বিভাব হয় বেসরকারী নানা সংস্থা বা এনজিও। বিশ্বব্যাপী এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায়  বাংলাদেশে বর্তমানে দুই হাজার এর বেশী এনজিও তাদের এজেন্ডা ভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ক্ষুদ্রঋণ, গবাদিপশু প্রদানসহ সকল ক্ষেত্রেই নারীকে যুক্ত করা হয়েছে। ধরেই নেয়া হয়েছে যে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে নারী ক্ষমতার অংশ হবে, নারী নিপীড়ন কিংবা বৈষম্য থাকবেনা। কিন্তু এই অনুমিতির বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ক্ষমতার পরিসর বহুমাত্রিক। কিছুটা ক্ষমতায়ন হয়েছে তবে তা নেহায়েত সামান্য। উন্নয়নের ধারায় নারী পূর্বের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশী শিক্ষার সুযোগ পায় ‍সমসাময়িক সময়ে।বোধ করি তাতে নারীর পূর্বের আর পরের অবস্থানের মাঝে তেমন ফারাক তৈরী হয়নি।কারন একজন অশিক্ষিত নারী সমাজে যতটা অধ:স্তন ও যেভাবে নিপীড়িত, অপর একজন শিক্ষিত নারীর ক্ষেত্রেও সেসবের তেমন হেরফের হয়না। ফলে অবস্থাদৃষ্টে যা দাঁড়িয়েছে তা কেবল নারীর প্রতি করুণা ও দেখানো সত্য। নারী ক্ষমতায়ন ও পুরুষতান্ত্রিকতা পরস্পরবিরোধী দুই বিষয় এখন আমাদের সামাজিক কাঠামোয় যথাক্রমে তত্ত্বে ও প্রয়োগে। নারী বান্ধব আইনগুলো বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা তৈরির মূল উপাদান হল এই পুরুষতান্ত্রিকতা।

তথাকথিত “নারী ক্ষমতায়নে” ভরপুর বাংলাদেশে নারীকে স্ত্রীর অধিকার আদায়ে গর্ভধারণকে হাতিয়ার হিসেবে নির্বাচন করতে হয় আজো। আর সেই নারীটি যদি হন হিন্দু ধর্মাবলম্বী তাহলে তাকে উপর্যুপরি নয় মাস সাধনা করতে হয় যেন গর্ভের সন্তানটি জৈবিক লিঙ্গে পুরুষ হয়! কারণ, হিন্দু ধর্মমতে উত্তরাধিকারসূত্রে নারী সম্পত্তির অংশীদার হতে পারেনা! তথাকথিত সভ্য সমাজে তাই কিছু মানুষ বাধ্য হয়েই নারীকে অনাকাক্ষিত ভাবছে। কেননা, নারীকে লালন-পালন করে অন্যের ঘরে পাঠাতে হবে। সে সম্পত্তি পাবেনা, হতে পারবেনা মায়ের শেষ আশ্রয়!

“অসহায়” নারীদের সহায়তাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত অসংখ্য সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান আছে এদেশে। যেগুলোতে গেলে দিনের পর দিন ঘুরে শেষ জুতো জোড়াও ক্ষয় করা ছাড়া তেমন কিছু প্রাপ্তি হয়না। হাতেগোনা ২ থেকে ৩টি প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করে আক্ষরিক অর্থে সহায়তা করার। তাদের মাঝে ১ বা ২টি প্রতিষ্ঠান কর্তার কাছ থেকে নামেমাত্র কিছু টাকা আদায়ের বন্দোবস্ত করে নারীর অসহায়ত্ব মোচনের প্রয়াস চালান। একবারও জানার প্রয়োজন বোধ করেননা তাঁরা যে ঐ নারী শুধু কয়টি টাকার জন্য তাদের দ্বারস্থ হয়েছিলেন কিনা! নাকি তার প্রাপ্য সম্মানটুকু পেতেই এই লড়াই! যেখানে একজন নারীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে রণে নামতে হলে সমগ্র সমাজ তার শ্রাদ্ধ করে। এমনকি পরিবারেরও সমর্থন পায় কালেভদ্রে কোনো কোনো অতি সৌভাগ্যবতী। সেই অবস্থানে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজের মত করে দায়-সারা কিছু একটা চাপিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হন নিশ্চিন্তে! কৌতুককর ব্যাপার হলো ওই নামেমাত্র টাকাটিও “ক্ষমতাবান স্বামী” তার “ক্ষমতাহীন স্ত্রীকে” অত্যন্ত দয়াপরবশ হয়ে ঠিক সময়ে তো দূর আদৌ দিচ্ছে কিনা সে বিষয়ে তারা নিতান্তই উদাসীন। আবার কিছু সংগঠন বলে-ওইখানে যান,এখানে অনেক সময় লাগবে। এবং তাদের আচরণ মাশাল্লাহ তথৈবচ!অন্যখানে যাবার পরামর্শ দেয়া ভাল বিষয় তবে তারা আছেন কেন? সেবা দিতে না পারলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যুক্তিযুক্ত।এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বা দিন-ডাকাতি দিয়ে অনায়াসে বহাল তবিয়তে টিকে আছে যুগের পর যুগ। এদেশে এখনো কন্যা সন্তানের ভ্রুণ নষ্ট করা, কন্যা সন্তান প্রসবের পর মাকে তালাক দেবার অসংখ্য নজির রয়েছে। যার ফলে নারীর প্রতি দৃষ্টি ভঙ্গি পরিবর্তন তো দূরে থাক, নারীকে মানুষ ভাবতেই যেন বয়ে গেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের। হয়ত এমনটা সমাজের ভাবনা যে “বাঁইচা আছস এই বেশী। আবার অধিকার চাস!” সত্যিই তো! এভাবেই বেঁচে আছে, বেঁচে থাকে নারী!

-লেখক, শিক্ষার্থী, নৃ্বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print