শুক্রবার , ২০ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » শিকলে বাঁধা জীবন বীরঙ্গনা মজিরনের

শিকলে বাঁধা জীবন বীরঙ্গনা মজিরনের

Kurigram-martias-wife-tied-BM01একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকহানাদারবাহিনীর গুলিতে নিহত এক শহীদের স্ত্রী ও বীরাঙ্গনার জীবন এখন শিকলে বাঁধা। পরনে তার জীর্ণ ময়লা শাড়ি। খড়-কুটো দিয়ে তৈরি বিছানাতেই কাটছে গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত। বিছানাতেই সারের প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম। আর মানুষ দেখলেই কেঁদে ওঠেন হাউমাউ করে।

পশুর চেয়েও অধম জীবনযাপন করা সেই বীরঙ্গনার নাম মজিরন বেওয়া (৬৭ )। তিনি কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিলাই ইউনিয়নের বানিয়াটারী গ্রামের ধাপেরহাট বাজার এলাকার আনসার কমান্ডার শহীদ তমিজ উদ্দিনের স্ত্রী।

মজিরন বেওয়ার পরিবারের দাবি, মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ার কারণেই তাকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে বানিয়াটারী গ্রামে দিয়ে দেখা যায়, মাটির ঘরের মেঝেতে ডান পায়ের গোড়ালিতে শিকল বাঁধা অবস্থায় বসে রয়েছেন মজিরন বেওয়া। পরনে ময়লা জীর্ণ শাড়ি। খড়-কুটা দিয়ে তৈরি বিছানাতেই কাটছে গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীতের দিনরাত। ওই ঘরেই সারেন প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম। কোনো মানুষ দেখলেই শুরু করে দেন হাউ মাউ কান্না।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী (আইডি নং-৪৯১০৬৯৫৩৭০০১৭) মজিরন বেওয়ার জন্ম ১৯৪৮ সালের ১১ এপ্রিল। তার রয়েছে তিন সন্তান। দুই মেয়ে মাজেদা বিবি ও ফাতেমা বিবি। ছেলে আব্দুল মজিদ(৪৮)। বিয়ে হয়ে গেছে সবার। বাড়ি ভিটেসহ প্রায় ছয় বিঘা কৃষি জমি রয়েছে।

বীরঙ্গনার পরিবার ও স্থানীয়রা জানায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জুনের শেষের দিকে এক সকালে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকবাহিনী মজিরন বেওয়াসহ তার গ্রামের ৬-৭ জন নারীকে তুলে নিয়ে যায় ভুরুঙ্গামারী কলেজ ক্যাম্পে। সেখানে গণধর্ষণ করে। এ খবর শোনার পর পরিবারের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য তৎকালীন আনসার কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা তমিজ উদ্দিন সরকার যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ৭-৮ জুলাই চলে আসেন বাড়িতে। এ সময় পাকহানাদার বাহিনী খবর পেয়ে আকস্মিকভাবে পরদিন বেলা ১১টার দিকে তমিজ উদ্দিন সরকারকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

শহীদ তমিজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল মজিদ জানান, যুদ্ধের সময় বাবাকে হত্যার ঘটনার পর থেকে মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তখন আমার বয়স ছিল ৬-৭ বছর। সে সময় অনেক কষ্টে মাকে চিকিৎসার জন্য কোচবিহারের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে পাবনা মানসিক হাসপালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসকগণ দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও ওষুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। যা অর্থাভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

আব্দুল মজিদ আরো জানান, মায়ের চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে ১৯৮৩ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষদূত এইচ এম এরশাদের শাসনামলে পাঁচ হাজার টাকা দেয়া হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৯ সালে ২০ হাজার টাকা অনুদান দেন। এছাড়াও শহীদ পরিবার হিসেবে প্রতি তিন মাস পর-পর প্রায় ৪৫ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। অগ্রণী ব্যাংকের ভূরুঙ্গামারী শাখা থেকে মায়ের টিপসইয়ের মাধ্যমে এই টাকা উত্তোলন করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে এই শহীদ পরিবারদের জন্য তিন রুম বিশিষ্ট একটি পাকা বাড়ি নির্মাণাধীন রয়েছে।

স্থানীয় অধিবাসী শিক্ষক আনোয়ার হোসেন রুমি অভিযোগ করে বলেন, একজন মানুষ সুস্থ্য না থাকলে তার বাড়ি দিয়ে কি হবে। তিনি তার যথাযথ চিকিৎসার দাবি জানান। রাষ্ট্র ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে বীর শহীদের স্ত্রী ও বীরাঙ্গনার অমানুষিক কষ্ট লাঘব করা সম্ভব ।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইউনিট কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, বীরাঙ্গনা মজিরন বেওয়া দীর্ঘদিন থেকে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভোগার কারণে পরিবারের লোকজন তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ফান্ডে চিকিৎসা সেবার জন্যে টাকা বরাদ্দ না থাকায় আমরা তাদের সহযোগিতা করতে পারছি না। তবে বিষয়টি মানবিক বিধায় সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print