শুক্রবার , ২০ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » জাতীয় » আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস

আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস

Population_day‘নারী ও শিশু সবার আগে, বিপদে-দুর্যোগে প্রাধান্য পাবে’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে প্রতিবারের মতো এবারও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। এর মধ্যে রয়েছে র‌্যালি, আলোচনা সভা ইত্যাদি।

 

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০১৫ এর প্রতিপাদ্যকে সার্থক ও এ বিষয়ে সকলকে সচেতন করার লক্ষ্যে সারা দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় প্রতিপাদ্যের গুরুত্ব এবং এ বিষয়ে সেবাকেন্দ্রগুলোর করণীয় বিষয়ে আলোচনা সভা ও র‌্যালির আয়োজন করা হয়েছে। দিবসের মূল অনুষ্ঠান হবে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বক্তব্য রাখবেন।

 

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ে কর্মরত প্রতিষ্ঠান ও সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে জাতীয়ভাবে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ কর্মী ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হবে। একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা, জনসংখ্যা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং বাল্যবিবাহ, কিশোরীর স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ প্রতিবেদনের জন্য মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হবে। এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে রেডিও এবং টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর থেকে স্মরণিকা, লিফলেট, পোস্টার ও বিভিন্ন দৈনিকে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৫১ সালে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ৩ লাখ। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ বাড়ছে। বর্তমানে জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৭২ লাখ। দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ১৫ জন মানুষ বাস করে। এ মুহূর্তে ১ দশমিক ৩৭ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে।

 

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। যদিও আয়তনের হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯৪তম; ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর নবম।

২০০১ সালের আদমশুমারিতে দেশের মানুষের সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৪৩ লাখ ৫৫ হাজার। ঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮৩৪ জন।

২০১১-এর আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী পুরুষ ও নারীর সংখ্যা যথাক্রমে ৭ কোটি ১২ লাখ ৫৫ হাজার এবং ৭ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার অর্থাৎ নারী ও পুরুষের অনুপাত ১০০:১০৩। জনসংখ্যার নিরিখে এটি বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। এখানে জনবসতির ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১,০৫৫ জন, যা সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ (কিছু দ্বীপ ও নগর রাষ্ট্র বাদে)। দেশের অধিকাংশ মানুষ শিশু ও তরুণ বয়সী : যেখানে ০–২৫ বছর বয়সিরা মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ, সেখানে ৬৫ বছরের বেশি বয়সিরা মাত্র ৩ শতাংশ। এ দেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছর।

জাতিগতভাবে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ অধিবাসী বাঙালি। বাকি ২ শতাংশ অধিবাসী বিহারি বংশোদ্ভূত এবং বিভিন্ন উপজাতি সদস্য। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৩টি উপজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা উপজাতি প্রধান। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের উপজাতিগুলোর মধ্যে গারো ও সাঁওতাল উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া কক্সবাজার এলাকায় মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে।

মোট জনগোষ্ঠীর ২১.৪ শতাংশ শহরে বাস করে; বাকি ৭৮.৬ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের অধিবাসী।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্পদের তুলনায় অধিক জনসংখ্যা বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। ২০৫০ সালে বাংলোদেশের জনসংখ্যা ২২ কোটিতে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে মৌলিক প্রয়োজন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহসহ সব রকম সেবা ও অবকাঠামোর ওপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ ও রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নূর-উন-নবী বলেন, আমাদের নগরগুলোতে লোকসংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতে বৃদ্ধির হার বেশি। কারণ এখানেই তুলনামূলক সহজে কিছু না কিছু কাজ মেলে। অন্য কোনো শহরের প্রতি ঢাকার মতো আকর্ষণ নেই। এ কারণে আমাদের জন্য একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যে যেখানে আছে তাকে সেখানেই রাখার ব্যবস্থা করা। কৃষিতে আমাদের অগ্রগতি উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু গ্রামে সক্ষম ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীকে ধরে রাখতে হলে অকৃষি খাতের ওপরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে চাই শহরের মতো শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা। চীনে হাউজহোল্ড ইকোনমি খুব জনপ্রিয়। প্রতিটি পরিবার কিছু না কিছু শিল্প বা সেবা উৎপাদন করছে। এতে দেশের প্রয়োজন মিটছে, আবার দেশের বাইরেও যাচ্ছে। আমাদের রয়েছে ১৬ কোটি লোকের ৩২ কোটি হাত। এদের মধ্যে এখন উৎপাদনক্ষম অংশেই বেশি। তারা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে এবং কাজের ব্যবস্থা করা গেলে আমরাও শিল্প বিপ্লবের পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারব। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে নারীদের প্রতি। এখন সমাজে নারী ও পুরুষের সংখ্যা মোটামুটি সমান। একসময় পুরুষের সংখ্যা কিছুটা বেশি ছিল। প্রতিটি নারীই যেন হয়ে উঠতে পারে সমাজের সার্বিক বিকাশের কর্মী, সেটা নিশ্চিত করা চাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারী। সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী। স্পিকার নারী। স্কুলে ছাত্র ও ছাত্রী সংখ্যা সমান। এসবই যথেষ্ট নয়। একটি সাম্প্রতিক গুরুত্ব পাওয়া প্রসঙ্গ বলি। নারীদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করার কথা কিছুদিন আলোচনা হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা এমন সিদ্ধান্ত নেবেন বলে মনে হয় না। আমাদের ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ধরা হয়। ১৬ বছর বয়সে একটি মেয়ের বিয়ে হলে তার ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই মা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাহলে কি শিশু আরেকটি শিশুর জন্ম দেবে? আমরা বাল্যবিবাহ বন্ধ করার কথা বলছি। স্বাভাবিকভাবেই আইন করে বাল্যবিবাহকে বৈধ করার প্রশ্ন আসে না। নারীকে পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠতে হবে, যার থাকবে দায়িত্বশীলতা, দায়িত্ববোধ। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় থাকবে এবং তার বাস্তবায়নেও অংশ নেবে। এখন অনেক নারী সমাজকাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু আবার এটাও দেখছি যে, অনেক পুরুষ বাইরে গণতন্ত্রের চর্চার কথা বলছেন, কিন্তু নিজের ঘরেই স্বৈরাচার। নারী কেন পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে, সেটা অনেকেই পছন্দ করেন না। সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে পৌরুষ। আমরা চাই প্রতিটি নারী যেন তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। এ চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। তাতে জয়ী হওয়া সহজ নয়। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত রয়েছি উৎসাহব্যঞ্জক অবস্থায়। এর গতি বাড়ুক, সেটাই কাম্য। তাতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ রাখার লক্ষ্য অর্জন যেমন সহজ হবে, তেমনি একটি উন্নত ও গর্বিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথেও আমরা এগিয়ে যেতে পারব দৃপ্ত পদক্ষেপে। মায়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনতে এর চেয়ে কাঙ্ক্ষিত আর কিছু হতে পারে না।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print