সোমবার , ২৩ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » বেসরকারি » এভাবেই দখল হচ্ছে তুরাগ!

এভাবেই দখল হচ্ছে তুরাগ!

untitled-1_145981দখল শুরু হয়েছে ব্রিজের গোড়া থেকে। ১৮ বছর আগে শুরু হলেও বিরুলিয়া ব্রিজের কাজ শেষ হলো মাত্র মাস দুয়েক আগে। আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন না হলেও ব্রিজের ওপর দিয়ে গত মে থেকে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলছে। মে মাসেই ব্রিজের গোড়ায় তুরাগ নদের জমি দখল করে কার্যালয় স্থাপন করেছে ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগ। তারপর ব্রিজের অদূরেই তুরাগ দখলে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা পল্লী পুনর্বাসন প্রকল্প নামে একটি সংগঠন। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে জমি দখলের জন্য গড়া এই প্রকল্প আবার দখলদারিত্ব ধরে রাখতে টিনের ছাপরা ঘরে নির্মাণ করেছে ‘বঙ্গবন্ধু জামে মসজিদ’।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এবং সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরসহ কারোরই মুক্তিযোদ্ধা পল্লী পুনর্বাসন প্রকল্পের নামে তুরাগ দখলের ব্যাপারে কিছু জানা নেই বলে সমকালের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বঙ্গবন্ধুর নামে মসজিদ করার ব্যাপারেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে কোনো অনুমোদন চাওয়া হয়নি। ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুরা হোসেন সমকালকে জানান, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো কিছু করতে হলে মেমোরিয়াল ট্রাস্টের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। আবার চাইলেই অনুমোদন পাওয়া যায় না। এ জন্য জমিটি যে নিষ্কণ্টক, তা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় দলিল জমা দিয়ে আবেদন করতে হয়। এরপর ট্রাস্টের বোর্ড সভা থেকে সভাপতি শেখ হাসিনা অনুমোদন দিলেই বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো কিছুর নামকরণ করা সম্ভব হয়। এর অন্যথা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগ ও মুক্তিযোদ্ধা পল্লী পুনর্বাসন প্রকল্প পরস্পর যোগসাজশে এ দখলকাণ্ড করছে বলে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে। ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগের নামে টানানো সাইনবোর্ডে আবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর ঠিকানা রয়েছে। জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ জানালেন, ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগ নামে একটি সংগঠন আছে বটে, তবে ওই সংগঠনের সঙ্গে জাতীয় শ্রমিক লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি আওয়ামী লীগের কোনো সহযোগী সংগঠনও নয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রমিক লীগের অন্য এক নেতা জানালেন, ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগ আসলে জাতীয় শ্রমিক লীগের পদবঞ্চিত নেতাদের একটি প্ল্যাটফর্ম। এ নাম ব্যবহার করে কতিপয় ব্যক্তি দখল ও চাঁদাবাজি করে চলেছেন। ঢাকা বিভাগ

শ্রমিক লীগ নামে সক্রিয় এ সংগঠনটিকে হরতালবিরোধী মিছিল-সমাবেশে বেশ সরব দেখা যায়। মাঝে মধ্যে তাদের আয়োজিত সভা-সমাবেশে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও আতিথ্য গ্রহণ করেন। এর সভাপতি হলেন নূরুল ইসলাম। তবে মূলত নেতৃত্ব দেন সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী। বিরুলিয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগের নামে তুরাগ নদের জায়গা দখল সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ইনসুর আলী বলেন, বিরুলিয়া এলাকায় যারা কমিটি করেছেন, তারা নিজেদের বসার জন্য ওই ঘরটি নির্মাণ করেছেন। বসার জায়গা করার জন্য নদীর জায়গা দখল করা হবে কেন জিজ্ঞেস করা হলে ইনসুর আলী বলেন, ‘কত লোকজন পুরো নদীই দখল করে ফেলছে, সেটা আপনারা দেখেন না। নদীর পাড়ে আমাদের লোকজন একটু বসার জায়গা করলে তার ওপর আপনাদের নজর পড়ে।’ তিনি মুক্তিযোদ্ধা পল্লী পুনর্বাসন প্রকল্পের সঙ্গে ঢাকা বিভাগ শ্রমিক লীগের যোগসাজশের অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা সংশ্লিষ্ট সকল সংগঠনের নিবন্ধীকরণের দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জামুকার। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা সংশ্লিষ্ট সকল সংগঠন, সংঘ, সমিতি, যে নামে অভিহিত হোক না কেন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালাও প্রণয়ন করার কথা জামুকার। জামুকার ওয়েবসাইটে তাদের নিবন্ধিত যে ১৬৫টি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়, তার ১১৩ নম্বরে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা পল্লী পুনর্বাসন প্রকল্পের নাম। এ সংগঠনের ঠিকানা হলো- গ্রাম :মাথাভাঙ্গা, ডাক :জলমা, উপজেলা :বটিয়াঘাটা, জেলা :খুলনা। ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, সংগঠনের সভাপতি শেখ আবদুর রাজ্জাক, সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার দেবনাথ ও সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মাহমুদ আলম খোকন।

ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার দেবনাথ জানান, তাদের সংগঠনের নামে একটি আবাসন প্রকল্পের কাজ চলছে ঢাকার মিরপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায়। নদের জায়গায় প্রকল্প গ্রহণের কোনো সুযোগ আছে কি-না জানতে চাইলে অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, তিনি এখনও জায়গাটি দেখেননি। এটি দেখভাল করছেন মিরপুরের মকবুল হোসেন। এই মকবুল হোসেনের পরিচয় জানতে চাইলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন অশোক কুমার। পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে আলাপ হয় মুক্তিযোদ্ধা পল্লী পুনর্বাসন প্রকল্পের সভাপতি শেখ আবদুর রাজ্জাক ও সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মাহমুদ আলম খোকনের সঙ্গে। তারা দু’জনই তাদের সংগঠনের নামে ঢাকার কোথাও কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করেন। সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মাহমুদ আলম খোকন বলেন, তার অজ্ঞাতে সংগঠনের এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ নেই। কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে সভা করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের সংগঠন থেকে নেওয়া হয়নি।

সরেজমিন প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেলোয়ার হোসেন দিলু নামে এক ব্যক্তির সন্ধান মিলেছে। তিনি জানান, এ জায়গাটি সরকারের জমি, এটা সত্য। তবে দীর্ঘদিন ধরে তুরাগ তীরে এই জায়গা তিনি ভোগদখল করে আসছিলেন। সম্প্রতি মকবুল ও আকবর নামে দুই ব্যক্তি এসে তাকে বোঝান, এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে একটি প্রকল্প করে আবাসন তৈরি করা হলে তারা নিজেরা তো লাভবান হবেনই, সঙ্গে মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবেন দরিদ্র অসহায় কিছু মুক্তিযোদ্ধাও। এসব শুনে তিনি সম্মত হয়েছেন। দেলোয়ার হোসেন দিলুর কাছ থেকে আকবর ও মকবুলের দুটি মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা গেলেও বারবার চেষ্টা করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা সংশ্লিষ্ট সকল সংগঠনের নিবন্ধীকরণের দায়িত্ব জামুকার। অবশ্য নিবন্ধিত ওই সব সংগঠন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করলে জামুকার অনুমতি নিতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রীকে মুক্তিযোদ্ধা পল্লী পুনর্বাসন প্রকল্পের নামে তুরাগ নদের জায়গা দখলের বিষয়টি অবহিত করা হলে তিনি এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ভাঙিয়ে কেউ যেন কোনো দখলদারিত্ব চালাতে না পারে তা নিশ্চিত করবেন বলে জানান। পদাধিকার বলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রীই হলেন জামুকার চেয়ারম্যান।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, সর্বত্রই দখলদাররা নদ-নদী দখলের সময় ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে থাকে। তারপরই আজকাল ব্যবহৃত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নাম। পানির ওপরে টংঘরে বঙ্গবন্ধুর নামে যে মসজিদটি করা হয়েছে, তাতে একটি মাইক থাকলেও সব ওয়াক্তে আজান পর্যন্ত হয় না। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো তুরাগ নদ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় ২০১২ সালের ৬ নভেম্বর অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ করেন হাইকোর্ট।

সেখানে নদের পাড় থেকে কেন বালু ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হবে না ব্যাখ্যা চেয়ে উত্তর দিতে বলা হয়েছিল। এরও আগে ২০০৯ সালে রাজধানীসহ আশপাশের চারটি নদী অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের হাত থেকে উদ্ধার করতে নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। এখনও পর্যন্ত উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার মধ্যেই আটকে আছে আদালতের সেই নির্দেশনা এবং নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই নিত্যনতুন নামে দখল হচ্ছে নদীর জায়গা।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদীর কাছে তুরাগ থেকে দখল উচ্ছেদে আদালতের নির্দেশনা এবং তুরাগে আবারও দখল শুরু হওয়া সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি এখনও এ সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত নন বলে জানিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিল্গউটিএ) চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। বিআইডবিল্গউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর এম মোজাম্মেল হকও বিরুলিয়ায় নতুন করে নদ দখলের বিষয়টি মাত্রই শুনেছেন বলে জানালেন। তবে তিনি বলেন, নদের পাড় থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে আদালত যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা পালিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার কামরাঙ্গীরচর এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। আগামীকাল রোববার বিরুলিয়া এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print