বৃহস্পতিবার , ১৯ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » রকমারি » ভালোবাসা তারে ভিখারি করেছে!

ভালোবাসা তারে ভিখারি করেছে!

streetমানুষ, মানুষ হয়ে উঠেছে আবেগ অনুভব ও তার প্রকাশের পারঙ্গমতায়। এই একটি জায়গায় প্রাণিজগতের অন্যান্য প্রজাতি থেকে এগিয়ে মনুষ্যজাতি। প্রেমকে কখনো বস্তুজগতের কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়। এ এক স্বর্গীয় অনুভূতি। সাহিত্যিকরাও বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন বিস্তর। তবে প্রেমের কিন্তু বিনাশী শক্তিও আছে। কবিগুরু লিখেছিলেন, ‘তারা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না, শুধু সুখ চলে যায়।’ হ্যাঁ, সবসময় প্রেম আমাদের জীবনে সুখের বার্তা নিয়ে আসে না। তবে প্রেমে পড়ার অনুভূতি কিন্তু অসাধারণ! প্রেয়সীকে পাওয়ার জন্য সে সময় যে আকুলতা সৃষ্টি হয়, সেটিই কখনো কখনো দুর্নিবার হয়ে ওঠে। নেভানো যায় না সেই আকাঙ্ক্ষার যন্ত্রণা।

এভাবেই প্রথম দেখায় মিশেলের প্রেমে পড়েছিলেন ৩২ বছরের এক উঠতি মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। ক্যারিয়ারের সময়টা বেশ ভালোই যাচ্ছিল তার। নিউইয়র্কে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ একটি অফিসে বসতেন। তার অধীনে ছিল বেশ কয়েকজন কর্মীও। কিন্তু ২০১৩ সালে গ্রীষ্মে মিশেলকে দেখে তার জীবনে এল বড় এক পরিবর্তন। সেই সুখানুভূতি মিশেলকে জানালেন তিনি। তবে পত্রপাঠ প্রস্তাব নাকচ করে দেন মিশেল। কিন্তু প্রেমিকের আকাঙ্ক্ষা তখন দুর্নিবার। যেভাবেই হোক প্রেয়সীকে পেতেই হবে।

একদিন উইলিয়ামসবার্গ ব্রিজ পার হওয়ার সময় হঠাৎ করেই তার চোখে পড়ল ‘সাইকিক’ নামের একটি নিওন সাইন। এটি মূলত একজন গণকের কর্মস্থল; নানা তুকতাকে যে কিনা অসম্ভবকে সম্ভব করার দাবি করে থাকে। ২৬ বছর বয়সী গণকের নাম প্রিসিলা কেলি ডেলমারো। সে জানাল, সমস্যার সমাধান করা যাবে, কিন্তু খরচ হবে খানিকটা! খরচের প্রারম্ভে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভের পকেট থেকে খসল আড়াই হাজার ডলার। দ্বিতীয়বার দেখা করার সময় দিলেন আরো ৯ হাজার ডলার। তবে এটিই শেষ নয়। পরের ২০ মাসে এ গণকের পেছনে প্রায় ৭ লাখ ১৩ হাজার ৯৭৫ ডলার খরচ করেন সেই প্রেমিকপ্রবর! প্রেমের এমনই মহিমা!

এ কাহিনী পাওয়া গেছে নিউইয়র্কের গোয়েন্দা পুলিশের নথিপত্র ঘেঁটে। স্বাভাবিকভাবেই সেই ব্যক্তির নাম জানা যায়নি, যিনি প্রেমের জন্য এখন সর্বস্বান্ত। সাধের অ্যাপার্টমেন্ট, ব্যাংকে রাখা অর্থকড়ি সবই গেছে ডেলমারোর তুকতাকে। আশা ছিল একটাই, মিশেলকে অন্তত পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষতক কিছুই জোটেনি যুক্তরাষ্ট্রের এ তরুণের কপালে।

ফেরা যাক কাহিনীতে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে তৃতীয়বারের মতো ডেলমারোর সঙ্গে দেখা করতে যান সেই মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। এবার গণক চেয়ে বসল একটি হীরের আংটি। ডেলমারোর মতে, অশুভ আত্মার প্রভাব পড়েছে মিশেলের ওপর। আর তা দূর করতেই প্রয়োজন হীরে। সানন্দেই সেটি কিনে দেন মিশেলের স্বঘোষিত প্রেমিক। খরচ হয় প্রায় ৪০ হাজার ডলার। এবার তন্ত্রমন্ত্রের ফল চান তিনি। ডেলমারো বলল লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে খোঁজ নিতে।

কথামতো বান্দা হাজির। সেখানে সত্যিই দেখা পাওয়া গেল মিশেলের। এমনকি একটি সন্ধ্যাও কাটল তার সঙ্গে। কিন্তু এর পর থেকেই আবার লাপাত্তা মিশেল। অজ্ঞাতনামা সেই তরুণের জবানিতেই শুনুন তখনকার গল্প। পুলিশের নথিতে পাওয়া গেছে এ বক্তব্য। ‘মিশেলের সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তটি ছিল চমত্কার। আমি ভাবছিলাম, সব বুঝি ঠিক পথেই চলছে। কিন্তু আবার যোগাযোগ বন্ধ করে দিল সে। বলল, আমার আচরণ নাকি তার কাছে অদ্ভুত ঠেকছে। ফিরে গেলাম ডেলমারোর কাছে। সে বলল, অশুভ আত্মা এখনো মিশেলের আশপাশেই আছে। একে দূর করতে দু’দফায় লাগবে ৫৬ হাজার ডলার। এছাড়া একটি বিশেষ অনুষ্ঠান করতে চাইল আরো ৪০ হাজার ডলার। সবই দিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। তখন ডেলমারো বলল, ভিন্ন এক দুনিয়ায় আটকে আছে মিশেলের আত্মা। আর তাকে বিপদমুক্ত করতে লাগবে একটি স্বর্ণের তৈরি রোলেক্স ঘড়ি। মিশেলের কথা ভেবে তা কিনে দিয়েছি। এর পর আবার ৮০ হাজার ডলার চাইল গণক। তখন আমার আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও ব্যাংক থেকে তুলে দিয়েছি। এক বছরে ডেলমারোকে দিয়েছি প্রায় সাড়ে ৩ লাখ ডলার। সবই মিশেলকে পাওয়ার জন্য। তার কল্যাণের জন্যই এসব করা।’ ডেলমারো অবশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, মিশেলকে ফিরে পাওয়ামাত্রই সব অর্থ ফেরত দেবে সে। আর সেই ছলনায় ভুলেই তার সব আবদার মিটিয়ে যাচ্ছিলেন মিশেলের প্রেমিক।

তবে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণকের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসে ভাঙন ধরে তার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জানতে পারেন, যার জন্য এত কিছু করা, সেই মিশেলই মারা গেছে এক সপ্তাহ হলো। ‘আমি একেবারে ভেঙে পড়ি। ডেলমারোর ওপর বিশ্বাস টলে গিয়েছিল। আমি তার কাছে ছুটে যাই, জিজ্ঞেস করি। সে তখন বলে, আরেকজনের দেহে নাকি মিশেলের আত্মা এনে দেবে। মিশেলের পুনর্জন্ম হবে। আমাকে আবার লস অ্যাঞ্জেলেসে যেতে বলে। কিন্তু মিশেল হিসেবে যার সঙ্গে দেখা করতে বলে, তাকে দেখে আমার ভুল ভাঙে। আমি বুঝতে পারি যে, আমাকে ঠকানো হচ্ছে। সরলতা ও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। কিন্তু তত দিনে নিজের সব সম্পদ হারিয়ে ফেলেছি আমি। ধারও করেছি অনেক’, বলেন সেই অজ্ঞাতনামা তরুণ।

এর পর আইনের আশ্রয় নেন তিনি। ডেলমারো ও তার সহযোগীকে প্রতারণার দায়ে গ্রেফতারও করে পুলিশ। এখন শ্রীঘরে দিন কাটাচ্ছে এই দুই প্রতারক। কিন্তু মিশেল শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যায় সেই মার্কিন তরুণের কাছে। বরং অন্ধ বিশ্বাসের কাছে নিজের সব সুখ খুইয়ে ফেলেন তিনি।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print