শুক্রবার , ২০ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » কলেজ » বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট ‘সংবিধান পরিপন্থী’

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট ‘সংবিধান পরিপন্থী’

private University২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ আরেক ধাপ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ঘোষণা দিয়েছেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের উপর ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ হবে। অধ্যাপক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সাংবাদিকরা বলছেন, এতে উচ্চশিক্ষাকে ‘অনুৎসাহিত’ করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভ্যাট প্রয়োগ ‘সংবিধান পরিপন্থী’। কেননা শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের মধ্যে রাখা হয়েছে।

অভিভাবকরাও চিন্তায় আছেন, কারণ এই বাড়তি ভ্যাটের বোঝা তাদেরই বহন করতে হবে। এই ভ্যাট আরোপ করে প্রকারান্তরে সরকার শিক্ষাকে সেবামূলক না করে ‘পণ্য’ হিসেবে হাজির করছে এবং এটা যে ‘বাণিজ্য’ তা এতে প্রতিষ্ঠিত হবে। আর শিক্ষার্থীদের অভিমত, ভ্যাট দিয়ে শিক্ষা কিনে নেওয়ার আগে নির্ধারণ করতে হবে তারা শিক্ষার্থী না ক্রেতা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর ৪৪ (৭) ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জিত মুনাফা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন খাতের বাইরে কোথাও ব্যয় বা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয় নি। আইনের ৪১ ধারায় অর্থায়নের উৎস হিসেবে ‘শিক্ষার্থী ফি’ উল্লেখ করলে তা আইনানুসারে করমুক্ত হওয়ার কথা। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই আইনের দৃষ্টিতে ‘দাতব্য ট্রাস্ট’ হওয়ায় এর মুনাফার ওপর করারোপ সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জড়িত থাকার ওপর ভিত্তি করে একাত্তর টেলিভিশনের বার্তা বিভাগের পরিচালক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, উচ্চশিক্ষার প্রসারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা থেকে সরকার আইন করে এগুলো স্থাপনে ভূমিকা রেখেছে। এখন এই বাড়তি চাপ দেওয়া সঙ্গত না। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গত কয়েকবছরে গুণগত দিক থেকে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে ১৫ শতাংশ আয়কর দিতে হয়। এছাড়া বাড়ি ভাড়ার ওপরও ৯ শতাংশ কর দিতে হয়। তার ওপর আবার আসছে ১০ শতাংশ ভ্যাট। ভ্যাট কিন্তু পণ্য আর সেবা বাণিজ্যের জন্য প্রযোজ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকার আয়ের উৎস বাড়াতে ২০১০ সাল থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনাফার ওপর করারোপের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ’ এর সভাপতি শেখ কবীর হোসেন বলেন, আসলে এধরনের প্রচেষ্টা জাতীয় জীবনে খুব ভালো ফল আনবে না। আমরা জুনের ১৬ তারিখ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। আশা করছি তিনি বাস্তবতা বুঝতে পারবেন।

তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের ক্ষতিকর দিকগুলো আমরা নানাভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। শিক্ষাকে পণ্য বিবেচনা করার প্রচেষ্টা বন্ধ হবে আশা করি।’

বেসরকারি বিশ্ববিদালয়ের ওপর প্রস্তাবিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ছাত্র সংগঠনও। আসন্ন ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রস্তাবের বিরোধিতা কর কয়েকটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। তারা বলেছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট আরোপের ফলে উচ্চশিক্ষায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির পথ রুদ্ধ হয়ে এ শিক্ষা ধনিক শ্রেণির হাতে চলে যাবে। ছাত্র ইউনিয়ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় চক্রবর্তী বলেন, ইউজিসির তৈরি ২০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্রের প্রথম ধাপ হচ্ছে, ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনাকারীদের উপলদ্ধি করতে হবে যে শিক্ষা কোনও পণ্য নয়, শিক্ষা আমাদের অধিকার।’

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, এভাবে শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপ করা রাষ্ট্রের ‘দর্শন শূন্যতার’ প্রমাণ। সরকার ধরেই নিয়েছে এখানে বাণিজ্য হয়, শিক্ষা হয় না। এই মানসিকতা থাকলে এসব বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিক্যাল কলেজ কোনওদিন প্রতিষ্ঠান হতে পারবে না। মৌলিক অধিকারে এ ধরনের হস্তক্ষেপ সংবিধান পরিপন্থীও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিমুদ্দিন খান বলেন, বেসকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল ধনীরা পড়ে তা না। এখন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও উচ্চশিক্ষা পেতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। সেক্ষেত্রে তাদের ওপর এই বোঝা চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষাকে সংকুচিত করবে। এটা ভীষণ শঙ্কার।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print