বুধবার , ২৫ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » সরকারি » হতাশা থেকে বাড়ছে অবৈধপথে বিদেশ গমন

হতাশা থেকে বাড়ছে অবৈধপথে বিদেশ গমন

men pacharদেশে যে হারে বেকারত্ব বেড়েছে সে তুলনায় বাড়েনি অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ কারণে বিদেশমুখী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মতো বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় জনশক্তি রফতানিতে ধস নামে।

এ ছাড়া চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৩ সাল থেকে সরকারিভাবে (জি টু জি) মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হলেও এ হার অতি নগণ্য। বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ কম হওয়ায় আশঙ্কাজনকভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার হার বেড়েছে। সংসারের অভাব অনটন দূর করতে দালালচক্রের খপ্পড়ে পড়ে অনেকটা ক্ষোভ ও হতাশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ সমুদ্রপথে অনিশ্চিত গন্তব্যে পাড়ি দিচ্ছে বলে মনে করছেন মনোবিজ্ঞানী ও জনশক্তি রফতানি খাত সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞরা।

জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) বঙ্গোপসাগর দিয়ে ২৫ হাজার মানুষ পাচার করা হয়েছে। যা গত বছরের এই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। শুধু তাই নয়, এই তিন মাসে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে তিন শতাধিক লোক মৃত্যুবরণও করেছে। হতভাগ্যদের অধিকাংশই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নাগরিক বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি এ্যান্ড মাইগ্রেটিং মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্যানুযায়ী ২০১৪ সালে বঙ্গোপসাগর দিয়ে মালয়েশিয়ায় পাচারকালে ৫৪০ জন বাংলাদেশী সমুদ্রের মধ্যেই মারা গেছেন। আর নিখোঁজ রয়েছেন অসংখ্য বাংলাদেশী।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সূত্র ধরে বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ‘অন্বেষণ’র শ্রম জরিপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে বার্ষিক বেকারত্ব বৃদ্ধির গড় হার ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০০০ সালে দেশের বেকার মানুষের সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ এবং ২০১০ সালে তা দাঁড়ায় ২৬ লাখে। একই হারে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেলে চলতি বছর তথা ২০১৫ সালে তা ৩৩ লাখে উপনীত হতে পারে বলে সংস্থাটি জানায়।

জনশক্তি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বেকারত্ব দূরের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বিদেশে কর্মী পাঠানো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মতো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় বিদেশে কর্মী প্রেরণে ধস নামে।

জনশক্তি রফতানি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে দেশে জনশক্তি রফতানিতে ধস শুরু হয়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ থেকে যেখানে জনশক্তি রফতানি হয় ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ জন, সেখানে ২০০৯ সালে কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জনে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে তিনটি বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে ১ লাখ ৩২ হাজার ১২৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৫ জন এবং মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৭৬২ জন যান। কিন্তু পরের বছর (২০০৯) তা কমে সৌদি আরবে মাত্র ১৪ হাজার ৬৬৬ জন, আরব আমিরাতে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৮ জন এবং মালয়েশিয়ায় ১২ হাজার ৪০২ জনে নেমে আসে। এর পরের বছরগুলোতে তো জনশক্তি রফতানির হার আরও কয়েক ধাপ নিচে নেমে আসে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এ তিনটি দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রফতানি একপ্রকার বন্ধই হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৪ সালে সৌদি আরবে মাত্র ১০ হাজার ৬৫৭ জন, আরব আমিরাতে ২৪ হাজার ২৩২ জন এবং মালয়েশিয়ায় ৫ হাজার ১৩৪ জনসহ সর্বসাকল্যে জনশক্তি রফতানি হয় ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ জন।

এদিকে চার বছর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ থাকার পর ২০১২ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে (জি টু জি) ওই দেশের সরকারের কর্মী পাঠাতে সমঝোতা চুক্তি সই হয়। মালয়েশিয়ায় যেতে নিবন্ধন করেন প্রায় ১৪ লাখ মানুষ। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন কখনো বলেছেন বছরে ৫০ হাজার, কখনো বলেছেন এক লাখ কর্মী এ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় পাঠানো সম্ভব হবে।

২০১৩ সালের মার্চ মাস থেকে জি টু জি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হয়। গত দুই বছরেরও বেশি সময়ে দেশটিতে সর্বসাকল্যে সাড়ে ৭ হাজারের মতো কর্মী প্রেরণ সম্ভব হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি সৌদি আরবের বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হলেও নারী কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রেই দেশটির প্রথম অগ্রাধিকার।

রামরুর চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী মানব পাচারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘সাগরপথে যারা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশই কিন্তু দারিদ্র্যপীড়িত, উপকূল বা সিডর-আইলা এলাকার মানুষ। এ সব এলাকার মানুষ এমনিতেই দরিদ্র। অন্যদিকে এ সব এলাকার মানুষের বিদেশে যাওয়ার হারও কিন্তু অনেক কম। দারিদ্র্যতা, মূর্খতা ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ দালালচক্র মানুষকে ভাল বেতনে চাকরির কথা বলে অবৈধপথে বিদেশমুখী করছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় বলে এসেছি বৈধপথে অভিবাসন কমে গেলে অবৈধপথে অভিবাসন বেড়ে যায়। থাইল্যান্ডের জঙ্গলে প্রতিদিনই নতুন গণকবর আবিষ্কৃত হচ্ছে। থাই পুলিশও বলছে, গণকবরে থাকা বেশিরভাগই বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের। মালয়েশিয়ায় পাচারের আগে এদের গভীর সমুদ্রে বা থাই উপকূলের জঙ্গলে নিয়ে এ সব পরিবারের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। যারা দিতে পারেন না তাদের করুণ মৃত্যু ঘটে।’

সরকারকে জি টু জি পদ্ধতি বাতিল করার পরামর্শ দিয়ে ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি স্পষ্ট বলতে চাই, মালয়েশিয়ায় জি টু জি নিয়ে সরকার যে প্রত্যাশা মানুষকে দেখিয়েছিল সে অনুযায়ী যদি কর্মী পাঠাতে পারত তাহলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে যাওয়ার প্রবণতা অনেক কমে যেত। যেহেতু মানব পাচারের ঘটনা মালয়েশিয়াকেন্দ্রিকই বেশি, সেহেতু এ মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে জি টু জি বাতিল করে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রেখে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে লোক পাঠানো উচিত। কারণ কেউ বিপদে পড়লে তাদের কমপক্ষে লাগাম টেনে ধরা যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন শুধু বনায়ন খাতে কর্মী যাচ্ছে। কিন্তু কেন, দেশটিতে তো নির্মাণ ও সেবা খাতসহ অন্যান্য খাতেও কর্মী প্রয়োজন। বাকি সব খাতেও যাতে কর্মী যেতে পারে সরকারের সে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকুপ) সভাপতি শাকিরুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলেন, ‘দেশের ৭৬ ভাগেরও বেশি যুবক ভাল বেতনের আশায় স্থানীয় দালালচক্রের খপ্পড়ে পড়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঘর ছাড়ছেন। কিন্তু পথে কোনো এক জায়গায় (গভীর সমুদ্রে বা থাইল্যান্ড জঙ্গলে) তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে।’

সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়া নিয়ে ২০১৪ সালে নিজ সংগঠনের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে শাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ায় মানুষ আশান্বিত হলেও জি টু জি পদ্ধতিতে আশানরূপ জনশক্তি রফতানি করা সম্ভব হয়নি। মালয়েশিয়ায় যেতে ১৪ লাখ মানুষ নাম রেজিস্ট্রেশন করে দীর্ঘদিনেও তারা আশার আলো দেখেননি।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময়ে জি টু জিতে মালয়েশিয়ায় যেতে না পেরে অনেকেই হতাশায় ভুগছেন। অনেকের আবার বয়সও চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে দালালচক্র গ্রামগঞ্জে গিয়ে বোঝাচ্ছে- তোমরা যেহেতু রেজিস্ট্রেশন করেছ, তাই যে কোনোভাবে মালয়েশিয়া গেলেই বৈধভাবে ভাল বেতনে চাকরি করতে পারবে।’

হতাশা থেকে মানুষের জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান বলেন, ‘মানুষের মধ্যে হতাশা এক দিনে জন্ম নেয় না, দীর্ঘদিনেই হয়।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘জি টু জি পদ্ধতির সঙ্গে মানব পাচারের কোনো সম্পর্ক নেই। সংঘবদ্ধ দালালচক্র মানুষকে ভুল বুঝিয়ে কিংবা ভাল চাকরির লোভ দেখিয়ে পাচার করছে।’

তিনি বলেন, ‘মানবপাচার রোধে আমরা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিয়েছি। সমুদ্রে কোস্টগার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্যও আমরা (প্রবাসী মন্ত্রণালয়কে) প্রস্তাব দেব।’

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শুক্রবার রাতে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মানবপাচার রোধে মৃত্যুদণ্ডসহ যে কঠোর আইন আছে তা প্রয়োগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সোচ্চার রয়েছে। সীমান্তে বিজিবি এবং সমুদ্রে কোস্টগার্ডের সদস্যরা সব সময় সজাগ রয়েছে। এ ছাড়া বিমানবন্দর দিয়েও যাতে কেউ অবৈধপথে বিদেশে যেতে না পারে এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে।’

সম্প্রতি থাইল্যান্ডে গণকবরের সন্ধান এবং মানবপাচার নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু শিবিরের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গত ১০-১৫ দিনে কিন্তু কোনো মানবপাচারের ঘটনা ঘটেনি। তা ছাড়া মানবপাচার চক্রকে ধরতে প্রশাসন সজাগ রয়েছে। অনেকেই ধরা পড়ছে। অনেকে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে। আজকেও কিন্তু দুই মানবপাচারকারী বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।’

দ্য রিপোর্ট24

আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print