শুক্রবার , ২০ এপ্রিল ২০১৮
মূলপাতা » রকমারি » স্বপ্নের আবাসে ৪০ পরিবার

স্বপ্নের আবাসে ৪০ পরিবার

4.1_219773_0দেওয়ানবাড়ি বস্তির ঝুপড়িতে থাকতেন শিরিন। গরমে ঘেমে একাকার, শীতে ঠাণ্ডায় কাঁপেন। বর্ষায় ঘর ভর্তি পানিতে। সামান্য সংসার আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে চৌকির ওপরে। নিচ দিয়ে আবার স্যুয়ারেজের লাইন। গন্ধে টেকা দায়। ভাগ্যকে মেনেই নিয়েছেন। কেবল মেয়েটাকে নিয়ে সব চিন্তা। মেয়ে বড় হচ্ছে। কখন কী হয়ে যায়! তাঁদের জীবন আর স্বপ্নটাই বদলে দিয়েছে একটি ঠিকানা। আরবানের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে বস্তিবাসীদের জন্য ফ্ল্যাটবাড়ি। ৪০ জন নারী কিস্তিতে শোধ করেছেন জমির দাম আর ফ্ল্যাটের খরচ। সেই অবিশ্বাস্য গল্পের শুরু ১৯৯৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি।

তাঁরা ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন ফর রিয়ালাইজেশন অব বেসিক নিডস (আরবান)-এর গণশিক্ষা কর্মসূচিতে। ঢাকার ২৪টি থানার ৪০০ শিক্ষাকেন্দ্রে অংশ নেন অন্তত ৬০ হাজার বস্তিবাসী নারী-পুরুষ ও কিশোর-কিশোরী। পরে যুক্ত হন সঞ্চয় ও ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা কার্যক্রমে। সাপ্তাহিক বৈঠক ও নানা অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বারবার আকুল আবেদন জানান একটি নিরাপদ আশ্রয়ের। নারীরাই সবচেয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন বস্তির জীবনে, যেখানে অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়া, সমাজবিরোধীদের প্রবল আনাগোনা-‘স্যার, আমাগো এট্টু থাওনের ব্যবস্থা কইরা দিলে বাঁইচা যাইতাম।’ তাঁদের নিরাপদ আবাসনের কথা ভেবেই শুরু হয় ‘আবাসন সহায়তা প্রকল্প-১’। মাসিক জমা দিতে হয় ৩০০ টাকা। সেই জমানো টাকায় ২০০১ সালে মিরপুর বড়বাগে কেনা হয় ছয় কাঠার একটি প্লট। ২০০৪ সালে জমির দখল পেয়ে শুরু হয় ফ্ল্যাট নির্মাণ।

শুরুতেই ছিল অনেক বাধা-বিপত্তি। ফ্ল্যাট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট হাউজিং সোসাইটিও বিক্রি করতে রাজি হচ্ছিল না বস্তিবাসীরা থাকবেন জেনে। বললেন আরবানের সমন্বয়কারী-প্রধান নির্বাহী কামাল উদ্দিন। আশপাশের অন্যান্য ফ্ল্যাটের মালিকরা বলছিলেন, ‘ওরা তো পাড়াটাকে বস্তি বানিয়ে ফেলবে।’ কয়েকবার বৈঠক হলো দুই পক্ষের। থানায় জিডিও করতে হলো নিরাপত্তা চেয়ে। তার পরও রাজি হলো না আবাসন প্রতিষ্ঠান। অবশেষে বললেন, ‘আমাদের কোনো এক কোনার মধ্যে জায়গা দিন।’

শুরু হলো নির্মাণকাজ। নগর গবেষণাকেন্দ্রের স্থপতি সালমা এ শফি এক পয়সা পারিশ্রমিক না নিয়ে তৈরি করে দিলেন সেই ফ্ল্যাটগুলোর নকশা, যেখানে প্রতি তলায় আছে আটটি ফ্ল্যাট। প্রতিটি ৪৫০ ও ৫৫০ বর্গফুটের। ৪০টি ফ্ল্যাটের প্রতিটিতে আছে দুটি শোয়ার ঘর, একটি রান্নাঘর, ডাইনিং স্পেস, বাথরুম ও বারান্দা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মুশার্রফ হোসেন ও মানবাধিকারকর্মী ড. হামিদা হোসেন উদ্বোধন করলেন সেই ঠিকানার। ২০১২ সালের ২৩ জুন থেকে বাড়িতে ওঠা শুরু হলো মানুষগুলোর। সেদিন নিশ্চয়ই চোখে পানি চলে এসেছিল কুলসুম আক্তারের। নিজের একটি টয়লেট আছে। আছে রান্নাঘর। অথচ দিনের পর দিন ৯টি পরিবারের এক রান্নাঘরে লাইন দিয়ে দাঁড়াতেন কখন রান্না করতে পারবেন। সাহেবদের বাড়িতে গিয়ে খাওয়ার পানির জন্য লাইন দিয়েছেন। কোনো দিন ফিরে এসেছেন খালি কলসি নিয়ে। ছুটেছেন অন্য কোথাও। মেয়েটা তাঁর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএতে পড়ছে। তাঁর ঘরে সাজানো আলমারিতে বই, টেবিলে ল্যাপটপ। তিনতলার মুচ্ছাবিরের ছেলেটি এখন স্কুলে পড়ে। মানুষের চোখও তাঁদের দেখে কুঁচকে ওঠে না। আর এই ফ্ল্যাটবাড়িটি হাউজিংয়ের অন্যান্য বাড়ির কাছে আদর্শ-পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আচরণগত দিক দিয়ে। তাঁরাও ভুলে যেতে চান তাঁদের অতীত।

‘এই ক্ষুদ্রঋণের মালিক তাঁরাই। আমরা কেবল তাঁদের টাকা দিয়ে তাঁদের জন্য ভালো কিছু যে করা যায়-সেটিই প্রমাণ করতে চেয়েছি।’ বললেন আরবানের নির্বাহী। আরো জানালেন, এ পর্যন্ত তাঁরা ফ্ল্যাটের ৫৪ শতাংশ টাকা পরিশোধ করে দিয়েছেন। বাকি টাকাও কিস্তিতে ১০ বছর মেয়াদের মধ্যে শোধ করে দেবেন। প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম পড়েছে সাড়ে সাত লাখ থেকে আট লাখ টাকার মতো। আরবান রামপুরার মেরাদিয়ায় এক বিঘা জমি কিনেছে। সেখানে আগামী বছর শুরু হবে নির্মাণকাজ। আট তলার ২০০ ফ্ল্যাটে গড়ে উঠবে আরো ২০০ পরিবারের স্বপ্নের নীড়।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print