শুক্রবার , ২০ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » বেসরকারি » ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যাংক ডাকাতি!

ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যাংক ডাকাতি!

ansarullahজসিম উদ্দিন আসাদের সঙ্গে রাজধানীতে পরিচয় হয় আব্দুল্লাহ আল বাকী ওরফে মাহফুজের। জসিমকে ‘ইসলাম’ ও ‘দ্বীনের’ পথে চলার পরামর্শ দেন তিনি। মাহফুজের সঙ্গে থাকলে তার জীবিকার সব ব্যবস্থা করা হবে বলেও আশ্বাস দেয়া হয়। মাহফুজের আশ্বাসে রাজধানীর অদূরে টঙ্গীর আউচপাড়ার ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন জসিম। সেখানে প্রায় চার মাস ধরে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ‘অপারেশনের’ বিভিন্ন কৌশল শিখেন তিনি।

দল নেতা মাহফুজ, সেকেন্ড-ইন-কমান্ড সুমন ও হাফিজসহ কয়েকজন জসিমকে বলেন, দ্বীনের জন্য টাকা সংগ্রহ করতে হবে। তাই ব্যাংকে ‘লুট’ করতে হবে। দ্বীনের জন্য লুট করতে গিয়ে প্রয়োজনে হত্যা করলেও পাপ নাই! সহযোগীদের এমন কথায় বিশ্বাস করে ডাকাতিতে অংশ নেন জসিম। সহযোগীদের সঙ্গে আশুলিয়ার কমার্স ব্যাংকের শাখায় ঢোকেন জসিমও। ডাকাতিতে বাধা দেয়ায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ওয়ালী উল্লাহর বুকে ছুরি চালান তিনিই। ডাকাতি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় এক প্রতিরোধকারীর পেটেও ছুরি ঢুকিয়ে দেন জসিম। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার অকপটে এসব ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দায় স্বীকার করেছেন তিনি।

ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় চাঞ্চল্যকর ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় জসিম উদ্দিন আসাদকে (২২) সোমবার রাতে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা জেলা পুলিশ। মঙ্গলবার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনুর রহমানের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন ‘উগ্রবাদী ডাকাত’ জসিম।

তিনি দাবি করেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে একটি উগ্রবাদী দল আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে। এই ডাকাতিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছে ১০ জন।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (এডিশনাল ডিআইজি) খন্দকার গোলাম ফারুক দাবি করেন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা তাদের জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে আশুলিয়ার ওই ব্যাংকে ডাকাতি করে। এ ডাকাতদলের অপর সদস্য ও পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।

ডাকাতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, আশুলিয়া থানার পরদির্শক (তদন্ত) দীপক চন্দ্র সাহা জানান, গত সোমবার রাত ৩টার দিকে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থেকে জসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনুর রহমানের আদালতে হাজির করলে আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পরই জসিম ডাকাতিতে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে অকপটে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। মঙ্গলবার আদালতে একইভাবে জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরআলতুলীর ফখরুল ইসলামের ছেলে জসিম। তিনি নিজের নাম আসাদ বলেও জানিয়েছিলেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে জসিম বড়। এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করে জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকায় আসেন। সেখানে আব্দুল্লাহ আল বাকী ওরফে মাহফুজের সঙ্গে পরিচয় হয় জসিমের।

এরপর মাহফুজ তাকে ইসলামের দ্বীনের জন্য জেহাদ করার কথা বলেন। সঙ্গে থাকলে আয়-উপার্জনের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানায় মাহফুজ। এতে প্রলুব্ধ হয়ে টঙ্গীর আউচপাড়ার আব্দুল খালেকের বাড়িতে সহযোগীদের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন জসিম। তাকে বিভিন্ন ইসলামী বই পড়ানো হয়। একই সঙ্গে অপারেশনের (ছিনতাই-ডাকাতি) কৌশলও শেখানো হতো। আর এসব দ্বীনের জন্য করলে পাপ হবে না বলে দাবি করেন মাহফুজ। এমনকি বিভিন্ন কাজে তাকে ছদ্ম নাম ব্যবহারের পরামর্শও দেয়া হয়।

জসিম তার জবানবন্দিতে বলেন, আশুলিয়ার কমার্স ব্যাংকে ডাকাতির উদ্দেশ্য ছিল ‘উপরের নির্দেশে অর্থ সংগ্রহ’ করা। ওই ডাকাতির ঘটনায় ১০ জন প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়, যাদের সবাইকে চেনেন না বলেও দাবি করেছেন জসিম।

জসিম বলেছেন, ডাকাতির সময় মাহফুজের সঙ্গে তিনি কমার্স ব্যাংকের আশুলিয়া শাখার ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় ব্যাবস্থাপক বাধা দিতে এলে তার বুকে ও পেটে ছুরি চালান তিনি। ব্যাংক থেকে বের হওয়ার পর এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মধ্যে পড়ে স্থানীয় একজনের পেটেও ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। ডাকাতির সময় গোলাগুলিতে সঙ্গীদের ছোঁড়া একটি গুলি জসিমের পায়ে বিদ্ধ হয়। এছাড়া বোমার স্প্লিন্টারও বিদ্ধ হয়েছে তার পায়ে। এ কারণে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পালিয়ে আশুলিয়ায় শ্বশুড় বাড়িতে অবস্থান নেন তিনি। পরদিন মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে এক ফুফুর বাড়িতে গিয়ে গাঁ ঢাকা দেন। সেখান থেকেই সোমবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

স্বীকারোক্তিতে জসিম দাবি করেন, দ্বীনের কথা বলার কারণে তিনিসহ কয়েকজন ডাকাতিতে অংশ নিয়েছেন। ডাকাতির সময় তাদের মনে হয়নি তারা মানুষ হত্যাসহ বড় অপরাধ করছেন।

ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নাজমুল হাসান ফিরোজ বলেন, ‘জসিমের কাছ থেকে ডাকাতি ও হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটিও উদ্ধার করা হয়েছে। কারা কীভাবে ডাকাতি করেছে তাদের ব্যাপারে আমরা বিস্তারিত জানতে পেরেছি। অপর ডাকাতদের ধরতে ব্যাপক অভিযান চলছে।’
তিনি বলেন, ‘জনতার হাতে আটক আল-আমিন ও বোরহান এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সুস্থ্য হলে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

সূত্র জানায়, ডাকাতদলের প্রধান বলে শনাক্ত হওয়া মাহফুজের বাড়ি শেরপুরের নকশরা উপজেলার কাজাইকাটা এলাকায়। তার বাবার নাম মৃত মজিবুর রহমান। জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অনুসারী মাহফুজ। তার সঙ্গে ডাকাত দলের কয়েকজন সদস্য রাজধানীর বসিলায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম প্রধান মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর মাদরাসায় গিয়েছিল। আউচপাড়ার আস্তানা থেকে রাহমানীর বইও উদ্ধার করে পুলিশ।

এ তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ধারণা করছে, ডাকাতরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের একটি দল। এই দলে সুমন ও হাফিজ নামে অন্যতম দুই সদস্য রয়েছে, যারা ডাকাতির ঘটনায় সম্মুখভাগে ছিল। মাহফুজ, জসিম ও আল-আমিনের সঙ্গে তারা অগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা ব্যবহার করে। ডাকাতির ঘটনায় তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছিল বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে গতকাল পর্যন্ত কোনো অগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।


আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print