মঙ্গলবার , ১৭ জুলাই ২০১৮
মূলপাতা » প্রধান খবর » মহররম মাস ও আশুরার করণীয় বর্জনীয়

মহররম মাস ও আশুরার করণীয় বর্জনীয়

প্রকাশ থাকে যে, ইসলামী বিধান মতে আরবী বারো মাসের মধ্যে মহররম মাস হলো প্রথম। প্রতিবছর এ মাস থেকেই নতুন হিজরী সালের গণনা শুরু হয়। অর্থাৎ এই চৌদ্দশ’ পঁয়ত্রিশ হিজরী থেকে চৌদ্দশ’ ছত্রিশ হিজরীতে এ মাস পাড়ি জমিয়েছে। পবিত্র কোরআনে এ মাসকে আশহুরে হুরুম বলা হয়েছে। যেমন- মহররম, রজব, যিলক্বদ ও জিলহজ। এ বারো মাসে আল্লাহ তাআলা সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ, অন্যায়-অত্যাচার, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ তথা শরীয়তবিরোধী সকল কার্যক্রম বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। তবে আল্লাহ কর্তৃক এইসব শাহী নিষেধাজ্ঞা কেউ লঙ্ঘন করলে সে অবশ্যই দ্বীনদ্রোহী। যা রাষ্ট্রদ্রোহিতা থেকেও অমার্জনীয় অপরাধ। এহেন অপরাধী কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত। এই মাসগুলো মূলত ইবাদত বন্দেগীরই মাস।
এরশাদ হয়েছে- হে নবী! আপনাকে তারা সম্মানিত মাস ও তাতে যুদ্ধ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করবে। আপনি তাদেরকে বলে দিন, এই মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ করা অনেক বড় গুনাহ। কিন্তু আল্লাহর কাছে সবচাইতে বড় গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখা। আল্লাহকে অস্বীকার করা, খানায়ে কাবার দিকে যাওয়ার পথ রোধ করা ও সেখানকার অধিবাসীদের সেখান থেকে বের করে দেয়া আর (আল্লাহদ্রোহিতার) ফেতনা-ফাসাদ হত্যাকা-ের চাইতেও বড় (অন্যায় কাজ)। (২ : ২১৭)
যেসব কারণে আশুরা ফজিলতপূর্ণ : প্রকাশ থাকে যে, মহররম মাসের দশম তারিখকে ইয়াওমে আশুরা বা আশুরার দিন বলা হয়। এ দিনে অতীতে যা ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে সংক্ষিপ্তভাবে তা তুলে ধরা হলো :
(এক) এই দিনে আল্লাহ তাআলা চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, সাত আসমান, সাত জমিন, জান্নাত-জাহান্নামসহ লওহে মাহফুজ এবং সকল সৃষ্টি জীবের ‘রুহ’ সৃষ্টি করেছেন। (দুই) এদিন আল্লাহ তাআলা পৃথিবী ও পৃথিবীতে নদী-নালা, সাগর-মহা সাগর, পাহাড়-পর্বত, বৃক্ষ-তরুলতা সৃষ্টি করেছেন।
(তিন) এদিনে আল্লাহ তাআলা আদি পিতা নবী হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে তাকে মা হাওয়া (আ.)-এর সাথে বিয়ে দিয়ে জান্নাতে আবাসন দেন এবং মরদুদ শয়তানের ধোঁকাকে কেন্দ্র করে এ দিনেই তাদের দু’জনকে পৃথিবীর দুই জায়গায় নির্বাসন দেন। উভয়ে সাড়ে তিনশ’ বছর পর্যন্ত স্বীয় অপরাধ স্বীকার করে কাঁদতে থাকেন আর এদিনেই আরাফাত ময়দানে দুজনের সাক্ষাৎ ঘটে এবং এদিনেই আল্লাহ তাআলা তাদের তওবাহ কবুল করেন।
(চার) এ দিনে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেট থেকে মুক্তি দান করেছেন। (পাঁচ) এ দিনেই হযরত মুসা (আ.) কুহে তুরে তাওরাত লাভ করেছেন। অতঃপর হক বাতিলের দ্বন্দ্বে বনী ইসরাঈলিদের ঈমানদ্বার উম্মতদের নিয়ে বাতিল ফেরাউনের বিরুদ্ধে জিহাদ করত, আল্লাহর হুকুমে গভীর নীল নদ নিরাপদে পাড়ি দেন আর ফেরআউন তাদের ধাওয়া করতে গিয়ে তার ষাট হাজার সৈন্য বাহিনী নিয়ে নীল নদে ডুবে মরে।
(ছয়) এ দিনে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে সর্বপ্রথম রহমতের বৃষ্টি নাজিল করেন। (সাত) এ দিনে আল্লাহ তায়ালা হযরত আইয়্যুব (আ.)-কে দীর্ঘ আঠারো বছর কঠিন রোগ ভোগের পর সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলেন।
(আট) এ দিনে আল্লাহ তায়ালার হুকুমে হযরত ইয়াকুব (আ.) তার হারানো প্রিয় পুত্র হযরত ইউসুফ (আ.)-কে ফিরে পান।
(নয়) এ দিনে আল্লাহ তায়ালা নূহ (আ.) ও তার অল্প সংখ্যক উম্মতকে মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি দিয়ে জুদি পাহাড়ে নৌকা থেকে জোড়া জোড়া প্রাণীসহ অবতরণ করান।
(দশ) এ দিনে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহিম (আ.)-কে সৃষ্টি করেন এবং নরাধম নমরুদের বিশাল অগ্নিকু-লী থেকে তাকে রক্ষা করেন। (এগারো) এ দিনে আল্লাহ তায়ালা হযরত ঈসা (আ.)-কে তার মায়ের পেট হতে পৃথিবীতে আগমন করায়েছিলেন এবং মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে এদিনেই তাকে বাতিলদের হাত থেকে রক্ষা করে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। (বার) এ দিনে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত নিয়ে হযরত জিবরাঈল (আ.) রাসূল (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়েছিলেন। (তের)  এ দিনেই আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত ঘটাবেন এবং আরাফাতের ময়দানে বান্দার ভালো-মন্দের বিচার করবেন, নেক্কারদেরকে হাউজে কাউসার পান করিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং বদকারদেরকে জাহান্নামে পাঠাবেন।
(চৌদ্দ) এ দিনেই ইতিহাসের নিকৃষ্টতম একটি রক্তাক্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে কারবালা ময়দানে ৬১ হিজরীতে। অবশেষে গোত্রপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বরচিত মতবাদতন্ত্র প্রীতি, রাজতন্ত্রী, ধূর্ত চরম স্বার্থপরায়ন, বলদর্পী ক্ষমতালোভী নির্দয় অত্যাচারী ইয়াজিদ ও তার পালিত কর্মী বাহিনী, যারা তাদের কালো হাতে তরুণ নির্ভীক বিরল সাহসী বীর, চেরাগে আহলে বাইতে জান্নাতবাসী শহীদগণের নেতা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের স্বপ্নময় ইসলামী খেলাফতের অনন্য আমীর, হযরত হোসাইন (রা.) শহীদ হন। ইন্নালিল্লাহি… রাজিউন। যার কারণে এই মাস, এই দিন ও এই সময় মুসলিম জাহানের জন্য একটি স্মরণীয়, বরণীয় ও ভাগ্য নির্ধারণের দিন।
এই মাসে ও দিনে করণীয় আমল
এ মর্মে রাসূল (সা.)-এর পক্ষ থেকে কয়েকটি হাদিস শরীফ। যেমন – (এক) যে ব্যক্তি এ মাসের প্রথম রাতে দু-দু’রাকআত করে আট রাকআত নামাজের প্রতি রাকআতে সূরা ফাতিহা একবার এবং সূরা ইখলাছ দশবার করে পড়বে বিনিময়ে রাসূল (সা.) আদায়কারীর নিজের ও পরিবার-পরিজনের জন্য শাফায়াত করবেন। তবে শর্ত এই যে, নামাজ আদায়কালে অবশ্যই তাকে এবং তার পরিবারকে শেরেক-বিদআত থেকে বিরত রাখতে হবে।
(দুই) যে ব্যক্তি এ মাসে প্রথম রাতে অর্থাৎ চাঁদ দেখা মাত্র চার রাকআত নামাজের প্রত্যেক রাকআতে সূরা ফাতিহা একবার ও ইখলাস এগারোবার পড়ে অতঃপর নামাজ শেষে ‘সুব্বুহুন কুদ্দুছুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালাইকাতি ওয়াররুহু’ তাছবীহটি তিন বার পড়বে আল্লাহ তাকে অসংখ্য সওয়াব দান করবেন।
(তিন) যে ব্যক্তি নিজের জন্য দোযখের আগুন হারাম করতে চায় সে যেন এ মাসে নফল রোজা রাখে।
(চার) এ মাসে ইবাদতকারী যেন কদরের রাত্রির ইবাদত করার ফজিলত লাভ করলো।
আশুরার দিনে করণীয় আমল
এ মর্মে রাসূল (সা.)-এর পক্ষ থেকে কয়েকটি হাদিস শরীফ বর্ণনা করা হলো :
(এক) এইদিনে পরিবার-পরিজনদের প্রতি উদার হাতে ব্যয় করলে আল্লাহ তায়ালা পুরো বছর তাকে সচ্ছল অবস্থায় রাখবেন। (দুই) যে ব্যক্তি এদিনে চার রাকআত নামাজের প্রত্যেক রাকাআতে সূরা ফাতিহা একবার, সূরা ইখলাস পনেরো বার পড়ে কারবালার শহীদগণের রুহু মুবারককে সাওয়ার রেসানী করবে বিনিময়ে শহীদগণ বিশেষ করে হযরত হোসাইন (রা.) এই আমলকারীর নাজাত ও সম্মানের জন্য কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন।
(তিন) যে ব্যক্তি এই দিনে রোজা রাখবে সে ষাট বছর দিনে রোজা ও রাতে ইবাদত করার সাওয়াব লাভ করবে। এই রোজার নিয়ম হলো আশুরার দিন একটি ও তার পরের দিন একটি। (চার) যে ব্যক্তি এ দিনে ইয়া মুক্বতাদিরু এ গুণবাচক ইসেম চারশ’ বার পড়বে সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে।
এই দিনে বর্জনীয় আমল
এ মর্মে রাসূল (সা.)-এর হাদিস- (এক) যে ব্যক্তি কারোর মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করার জন্য মাথা ন্যাড়া করে মুখ ও বুক চাপড়িয়ে বিলাপ করে এবং পোশাক ছিড়ে ফেলে এমন লোকদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। (দুই) যে ব্যক্তি এমন কবর জিয়ারত করে যাতে কোনো মরদেহ নেই সে অভিশপ্ত। এছাড়া, আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে গান-বাদ্য, বাজি ফোটকা ফুটানো, নারী-পুরুষ মিলে মিশে তাজিয়া মিছিল করা অথবা আলাদা আলাদা মিছিল করা, নিজের দেহ ক্ষত-বিক্ষত করা, কান্নাকাটি করা, শরীর ও কাপড়ে রং মাখা, খালি পায়ে-খালি গায়ে দৌড়াদৌড়ি করা, অপব্যয় জড়িত খানাপিনার আয়োজন করা, শব্দ দূষণ, দৃষ্টি দূষণ এবং বায়ু দূষণের কোনো কাজ করা, বাতি প্রজ্জলিত করা ইতাদি সব কাজ অবশ্যই শরিয়তসম্মত নয়। প্রসঙ্গত, সূরা আলে ইমরানের ৮৫নং আয়াতে হাকিমের অর্থ দিয়েই শেষ করলাম- ‘যে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন রীতিনীতির খোঁজ করবে তা কখনোই তার থেকে (আল্লাহর কাছে) গ্রহণীয় হবে না আর সে হবে আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত।’

আপনার মতামত

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*


Email
Print